
আমার সাথে ক্যারোলিনার পরিচয় হওয়ার আগে সে কখনোই জানত না যে বাংলাদেশ নামে একটা দেশ আছে। ডিপ্লোমা ক্লাসের প্রথম দিন যখন ক্যারোলিনার পাশে বসেছিলাম, সে ভেবেছিল আমি ভারতীয়। ল্যাটিন আমেরিকার মানুষ খুবই কম জানে বাংলাদেশ সম্পর্কে।
একদিন ক্যারোলিনার সাথে বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক অবস্থানের কথা বলে লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম। আমি তাকে বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক বাস্তব অবস্থার কথা তুলে ধরেছিলাম।
আমি তাকে বলেছিলাম— নারীর পোশাক বাংলাদেশের সমাজে এমন একটি ইস্যু, যেটি নিয়ে মাথা ঘামায় তৃতীয় একজন ব্যক্তি। সাধারণত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারী কী পোশাক পরবে, তা ঠিক করে দেয় তার পুরুষ অভিভাবক। বাংলাদেশি সমাজে নারীর জন্য একটি নির্ধারিত পোশাক আছে, আর সেটি হচ্ছে বোরকা, হিজাব।
এটা শুনে সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বোরকা, হিজাব কী? এটি কেন তোমার সমাজে নির্ধারিত পোশাক?”
আমি তখন তাকে বোরকা-হিজাবের কারণ আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মতো করে ব্যাখ্যা করেছিলাম এভাবে— বাংলাদেশের সমাজে নারীর শরীরকে মনে করা হয় কলা, তেঁতুল, চকলেটের মতো। বাংলাদেশের সমাজ নারীর শরীরকে আপাদমস্তক একটি যৌন বস্তু মনে করে থাকে, তাই তারা ভাবে নারীর শরীরকে ঢেকে রাখা উচিত। বাংলাদেশের অনেক পুরুষ মনে করে থাকে, নারীর শর্ট ড্রেস পরা যদি আধুনিকতা হয়, তাহলে ধর্ষণ করা পুরুষদের ব্যায়াম!
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সমাজে যে নারী হাফপ্যান্ট পরে, সেই নারী হচ্ছে চরিত্রহীন— লোকে তাকে বেশ্যা বলে গালি দেয়। আমি তাকে আরও বলেছিলাম, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে নারীরা বুকে ওড়না না পরলে প্রায়ই যৌন হয়রানির শিকার হয়।
ক্যারোলিনা তখন আমাকে প্রশ্ন করে বসেছিল, “ওড়না— ওটা আবার কী? সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ওড়না সেটি নিশ্চয়ই আত্মরক্ষামূলক কিছু, যেটা দেখে পুরুষ খুব ভয় পায়?”
আমি তার কথা শুনে শুধু হেসেছিলাম।
ক্যারোলিনা বাংলাদেশ নিয়ে পূর্বে সবসময়ই দারুণ সব কথাবার্তা শুনে এসেছিল আমার কাছ থেকে। বাংলাদেশের অসাধারণ প্রকৃতি, খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য, বাঙালি সমাজের পারিবারিক বন্ধন— এসবের প্রতি সে বরাবরই মুগ্ধ ছিল। তার খুব ইচ্ছা ছিল, কোনো একদিন সে বাংলাদেশ ভ্রমণ করবে।
ক্যারোলিনা সেদিন আমাকে হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুমি না বলেছিলে বাংলাদেশ সুন্দর?”
আমি তখন তাকে বলেছিলাম, “আমি তোমাকে ঠিকই বলেছিলাম— বাংলাদেশটি সুন্দর, তবে বাংলাদেশের সমাজের প্রথা, সিস্টেম, ব্যবস্থাপনাগুলো অসুন্দর।”
সবকিছু শোনার পরে ক্যারোলিনা বাংলাদেশের সমাজের পুরুষদের সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিল এভাবে— “তোমার সমাজের পুরুষরা মানসিক বিকারগ্রস্ত, যৌন নিপীড়ক। তারা নারীদের সম্মান করতে জানে না।”
আমি তার এই কথা শুনে লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে কফিতে শুধু চুমুক দিচ্ছিলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে শুধু ভাবছিলাম— সত্যিই তো, নারীরা বর্তমান বিশ্বে যেখানে চাঁদে যাচ্ছে, আর সেখানে আমাদের সমাজ এখনো নারীকে কলা, চকলেট, তেঁতুল বানিয়ে বস্তাবন্দি করে রেখেছে।
ওয়াজ মাহফিলে গর্ব করে হুজুররা নারীদের নিয়ে যেসব কুরুচিপূর্ণ ওয়াজ করে, আর সমাজের ৮০% মানুষ তাদের এইসব বক্তব্যগুলোকে হাসিমুখে গ্রহণ করে। এসব হুজুরদের ওয়াজগুলো যদি স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করে ক্যারোলিনাকে শোনানো হয়, তাহলে বাংলাদেশের সমাজের পুরুষদের সম্পর্কে ক্যারোলিনার কী ভয়ানক ধারণা হবে?
আমাদের সমাজ এখনো মনে করে থাকে, নারীর কর্তা হচ্ছে পুরুষ; নারী হচ্ছে পুরুষদের দাসী। আমাদের সমাজ এখনো মনে করে, নারীদের এই পৃথিবীতে জন্ম হয়েছে শুধু সন্তান উৎপাদন আর পুরুষকে যৌনতৃপ্তি দেওয়ার জন্য।
©️ Yeasir Arafat
