
কথা বলেন। মহামান্য সরকার, কথা বলেন। কথা বলেন, একশন নেন।
খুব দ্রুত আগুন ছড়াচ্ছে। রাস্তায় আমার সন্তানের লাশ। সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে বাবা হাটছেন, সন্তানের লাশ নিয়ে মা আহাজারি করছেন।
পৃথিবীর কোথাও সন্তানের লাশের চেয়ে ভয়ংকর জিনিস আর নেই। আপনাদের কি মনে হয়, আওয়ামী লীগ সরকার কেন পড়েছে? বিএনপি ফেলছে? আর্মি ফেলছে? আমেরিকা ফেলেছে? জামাত ফেলছে? এনসিপি ফেলছে? সমন্বয়করা ফেলছে? কেউ ফেলেনি। আওয়ামী লীগ পড়েছে সন্তানের লাশের কারণে।
যখন সন্তানের লাশের স্তূপ দেখা গেছে, মধ্যবিত্ত বাবা-মায়েরা রাস্তায় নেমে এসছেন; সরকার নাই হয়ে গেছে।সন্তানের লাশ জমতে দিয়েন না। সন্তানের লাশ বিনা চ্যালেঞ্জে পার হতে দিয়েন না।
কেন লাশ দেখা যাচ্ছে? সন্তানের লাশ। তিন মাস বয়সী লাশ, তিন বছর বয়সী লাশ।
হামের মতো একটা তুচ্ছ রোগ, যে রোগটাকে আমরা দূর করে দিয়েছিলাম দেশ থেকে, সেটাতে বাচ্চাদের লাশ নিয়ে বাবা-মায়েরা আহাজারি করে বেড়াচ্ছেন। এটা কেন হচ্ছে? এটা নিয়ে কথা বলতে হবে। মাননীয় সরকার, কথা না বললে কিন্তু পুরো দায়টা আপনাদের ওপর চলে আসবে। এবং আসা শুরু করেছে।
আমি জানি আপনাদের উপদেষ্টা মহলে, মন্ত্রিপরিষদে অনেক দক্ষ দক্ষ মানুষ আছেন। কিন্তু সম্ভবত কেউ অনুধাবন করতে পারছেন না যে স্ফূলিঙ্গ জ্বলে ওঠা শুরু হয়েছে। এই স্ফূলিঙ্গ যখন তখন দাবানলে পরিণত হতে পারে; যা আপনারা সরকারি লোহার ঘরে বসে বুঝতে পারবেন না।
দেখেন হামকে আমরা ঝেটিয়ে বিদায় করেছিলাম। সেই প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় ইপিআই শুরু হয়েছিল আমাদের এখানে; সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি। এরপর এরশাদের সময় সেটা ভালো একটা রূপ পায়।
এরপর ইপিআইতে বাংলাদেশ একটা রোল মডেলে পরিণত হয়। টানা তিন থেকে চারবার আওয়ামী লীগ সরকার শতভাগ টিকাদান সম্পন্ন করেছে; যার কারণে সারাবিশ্বে আমরা ঈর্ষার কারণ হয়েছি।
আপনারা জানেন যে একটা দেশে ৯৫ শতাংশ বাচ্চা যদি হামের টিকা পায়, তাহলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়, যারা টিকা পায়নি দু-চারজন তারাও আসলে বেঁচে যায়। এবং টিকা পাওয়াদেরও মৃত্যুর দিকে যায় না। কিন্তু কী এমন ঘটল যে দেড়টা দুটো বছর ধরে ইপিআইর কোনো টিকা অভিভাবকরা বাচ্চাদের দিতে পারলেন না? হামের মতো একটা টিকার অভাবে কেন আমরা লাশের সারি দেখতে পাচ্ছি? এগুলো নিয়ে কথা বলেন, এগুলো নিয়ে অ্যাকশন নেন।
আসল কথাটা তো আপনারা বোঝেন যে কী হয়েছিল। আইএমএফের চাপ ছিল, বহুজাতিক গোষ্ঠীগুলোর চাপ ছিল-সরকার যেন রিজার্ভ বাড়ায়। রিজার্ভ বাড়াতে গিয়ে তারা খোলা বাজার থেকে ডলার কিনছে, আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। যত সরকারি ভর্তুকিমূলক কর্মকাণ্ড আছে চেষ্টা করেছে সব জায়গা থেকে বাজেট কাটছাঁট করার। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, দুস্থ ভাতা থেকে শুরু করে সব বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কল্যাণমূলক যেসব কর্মসূচি ছিল জয়িতা বা এসব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এমনকি টিকা কেনাতেও হাত দেওয়া হয়েছে। ওই বাজেটটাও কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে নানা অজুহাত দিয়ে। আমরা টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে কিনব না, উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে কিনব; অমুক তমুক করে টিকা কেনা হয়নি। এমনকি সিরিঞ্জও কেনা হয়নি। মানুষ টিকাকেন্দ্রে গিয়ে পায়নি।
এই বিষয়গুলো আপনারা সামনে আনেন, শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন। তদন্ত করে কারা দোষী তাদের নাম সামনে আনেন।হাওয়াই কথা বলেন না, যে গত দুটো সরকার ধরে টিকাকরণ হয়নি বলে এই অবস্থা। আওয়ামী লীগের সময় আর যাই হোক টিকাকরণের কোনো সমস্যা হয়নি। তারা এই জিনিসটাকে গোল্ডেন লেভেলে নিয়ে গিয়েছিল।
তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের নাম সামনে আনেন। প্রতীকী শাস্তি হলেও শাস্তির ব্যবস্থা করেন। ওই সময়ে যিনি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ছিলেন, যিনি ডিজি হেলথ ছিলেন, এমনকি প্রধান উপদেষ্টা যিনি ছিলেন তাদের প্রতীকী শাস্তি হলেও প্রদান করুন। বলেন- আপনারা আদালতে ক্ষমা চান অন্তত। না বলাতে পারেন আপনারা স্টেটমেন্ট দিয়ে বলেন এইটা ছিল প্রকৃত কারণ।
আমি ইউটোপিয়ান না। আমি মার্কিন চুক্তি নিয়ে ইউনুস সরকারের জবাবদিহি আশা করি না। মার্কিনিরা কারো সাথে স্লেভারি চুক্তি করলে, ফিউচার-প্রুফ করেই করে। ফলে ও নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। কিন্তু সন্তানের লাশ নিয়ে তো কথা বলতেই হবে।
ওই যে বললাম সন্তানের লাশের ওজন যে কত ভয়াবহ এবং এটা যে কি দাবানল তৈরি করতে পারে; সেটা সম্ভবত আপনারা বুঝতেছেন না।
আপনারা কারে থ্রেট মনে করেন? আওয়ামী লীগ? জামাত? আর্মি? এনসিপি বা সিপিবি মতো দল? কেউ আপনাদের জন্য থ্রেট না। বাংলাদেশে কোনো সরকারের জন্য কোনো প্রতিপক্ষ থ্রেট না; একমাত্র থ্রেট মানুষ। একমাত্র থ্রেট এই মা-বাবারা। মা-বাবারা যদি রাস্তায় নেমে আসে কোথাও গিয়ে কূল পাবেন না।
বাবা-মায়েরা রাস্তায় নামার আগে লাশের হিসাব দেন।
