
ক’দিন আগেও আমরা অনেকে ভাবতাম নাহিদ রানা হয়তো ওয়ানডে ক্রিকেটে কার্যকর হবেন না। অথচ দেখুন, রানা নিজের দশম ওয়ানডে ম্যাচেই ক্যারিয়ারের দ্বিতীয়বারের মতো ‘ফাইভ-ফার’ (৫ উইকেট) তুলে নিলেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে মুস্তাফিজুর রহমানের পর আর কেউ এতো দ্রুত দুটো পাঁচ উইকেটের দেখা পাননি।
তবে কেবল উইকেটের সংখ্যা দিয়ে রানার প্রভাব বিচার করা যাবে না; সে বিশ্ব ক্রিকেটে যে কম্পন সৃষ্টি করেছে, সেটাই আসল। রানার প্রতিটা এরকম ম্যাচের পর বিশ্বখ্যাত ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন—রানা কেবল বাংলাদেশের সম্পদ নন, তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের এক ‘রেয়ার ট্যালেন্ট’।
১.
- নাহিদ রানার বোলিং আমাদের ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে গেল।
নাহিদ রানাকে যদি আমরা পূর্ণ শক্তিতে কাজে লাগাতে চাই, তবে তাকে ‘ফেয়ার উইকেটে’ খেলাতে হবে। আমাদের বর্তমান স্কোয়াডের সাত-আটজন খেলোয়াড়ই মূলত ফেয়ার উইকেটের উপযোগী, আর রানা সেখানে অন্যতম সেরা।
আগের ম্যাচে রানা ওভারপ্রতি ছয়ের ওপর রান দিয়ে বেশ খরুচে ছিলেন। সেই ম্যাচে আর আজকের ম্যাচের মধ্যে মূল পার্থক্য ছিল লেন্থের ব্যবহার এবং উইকেটের আচরণ।
রানা সাধারণত ‘শর্ট অফ গুড লেন্থে’ হিট করতে পছন্দ করেন। এই লেন্থ থেকে বল যখন অতিরিক্ত বাউন্স পায়, তখন তিনি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। আগের ম্যাচে উইকেটে পর্যাপ্ত বাউন্স না থাকায় বল ব্যাটারের জন্য সুবিধাজনক উচ্চতায় চলে আসছিল। কিন্তু আজ ফেয়ার উইকেটে সেই বাড়তি বাউন্সই ব্যাটারদের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনুইন শর্ট ডেলিভারি বা পেস দিয়ে ব্যাটারকে কাঁপিয়ে দেওয়ার অস্ত্রগুলো স্লো উইকেটে কার্যকর হয় না। তাই রানার মতো পেসারদের বিকাশে ভালো উইকেটের বিকল্প নেই।
আমাদেরকে অন্য কোন দেশ স্লো উইকেট দিলে আমরা খেলবো। কিন্তু যেচে স্লো উইকেট বানানো চলবেই না।
২.
দ্বিতীয় শিক্ষাটি হলো ম্যানেজমেন্টের ধৈর্য। আগের ম্যাচে রানার লাইন কিছুটা এলোমেলো ছিল, যা তার স্বভাবজাত বোলিংয়ের বাইরে। সাধারণত রানার কন্ট্রোল অবিশ্বাস্য; নিজের দুর্দান্ত বোলিং অ্যাকশনের কারণে তিনি সবসময় অফ-স্টাম্পের চতুর্থ বা পঞ্চম স্ট্যাম্পের ক্লাসিক চ্যানেলে বল করতে পারেন। কিন্তু আগের ম্যাচে তিনি সেটি পারেননি।
একজন জেনুইন এক্সপ্রেস বোলারের ক্যারিয়ারে মাঝে মাঝে এমন একটি ‘বাজে দিন’ আসতে পারে। সেদিন হয়তো তার গতি বা লাইন ঠিকমতো কাজ করবে না। এসব দিন দেখে যদি কেউ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে রানা বড্ড ব্যয়বহুল বা ‘শ্বেতহস্তী’ হয়ে যাচ্ছেন, তবে সেটি হবে মস্ত বড় ভুল।
মনে রাখতে হবে, নাহিদ রানা বা রিশাদ হোসেনের মতো খেলোয়াড়রা একেকটি বিশেষ অস্ত্র। তাদের মাঝে মাঝে ‘মিসফায়ার’ হতে পারে, কিন্তু যেদিন তাদের দিন হবে, সেদিন প্রতিপক্ষ রেহাই পাবে না। ম্যানেজমেন্টকে এই বিশ্বাসটা রাখতে হবে। একটি ম্যাচ বা একটি সিরিজের পারফরম্যান্স দেখে তাদের বিচার করা যাবে না, বরং নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যাক করে যেতে হবে।
একটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন—তৃতীয় ওয়ানডেতে রানাকে বিশ্রাম দেওয়া উচিত। দলে যেহেতু তানজিম সাকিব এসেছে এবং জয়ের জন্য লড়াই করার সামর্থ্য তারও আছে, তাই রানার ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার মানে হয় না। রানা হয়তো প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন যে, ‘যুদ্ধে নামলে গুলি খেতেই হয়’, কিন্তু সেনাপতি হিসেবে ম্যানেজমেন্টকে বুঝতে হবে কোন যুদ্ধে কাকে কখন পাঠাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় চাপে ফেলে এই দুর্লভ প্রতিভাকে ঝুঁকিতে ফেলা ঠিক হবে না।
বিশ্ব ক্রিকেটের এই অনন্য বিস্ময়—নাহিদ রানার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
