
অস্ট্রেলিয়ায় আরও একটি টেস্ট ম্যাচ দুই দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। গত কয়েক বছরে দেশটিতে এমন ঘটনা এবার নিয়ে চারবার ঘটল। অথচ এমন ফল এনে দেয়া অস্বাভাবিক বাউন্স করা পিচ নিয়ে এখনো তেমন কোনো সমালোচনা শোনা যাচ্ছে না। বরং নানা ধরনের অজুহাত সামনে আসবে। বলা হবে, ‘গ্রাউন্ডসম্যান; দুঃখিত, এখন তো তাকে টার্ফ এক্সিকিউটিভ বলা হয়; ভুল করে ফেলেছেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে গরম পড়ার কথা ছিল, তাই তিনি একটু বেশি ঘাস রেখে দিয়েছিলেন। আর সেখান থেকেই অতিরিক্ত বাউন্সের সৃষ্টি হয়েছে।’
আরেকটি প্রচলিত অজুহাত হবে, ব্যাটারদেরই নাকি এমন বাউন্স সামলানোর যথেষ্ট কৌশল ছিল না। তবে এই যুক্তি কিছুটা মেনে নেয়া যেত, যদি স্বাগতিক দলের ব্যাটাররা ভালো ব্যাটিং করতেন। কিন্তু যখন স্বাগতিক দলের ব্যাটাররাও রান করতে পারছেন না, এমনকি একটি ভালো জুটিও গড়ে উঠছে না, তখন পিচ সম্পর্কে সেটি কী বার্তা দেয়?
মেকাইয়ের পিচটি অবশ্য কোনো বিস্ময় ছিল না। প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে যেভাবে লজ্জায় ফেলেছিল, তার পর অস্ট্রেলিয়া যে দ্বিতীয় টেস্টের জন্য দ্রুতগতির ও বাউন্সি পিচ তৈরি করবে, সেটি অনুমান করাই যায়। অবশ্য বলা হবে, মাঠকর্মী নিজের সিদ্ধান্তেই এমন পিচ বানিয়েছেন এবং দলীয় ব্যবস্থাপনা থেকে কোনো নির্দেশ দেয়া হয়নি। আমরা সবাই জানি বাস্তবে কী ঘটে। পার্থক্য হলো, ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট নিজেদের বোলিং শক্তির সঙ্গে মানানসই পিচ চাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যেই স্বীকার করে। আর পুরোনো শক্তিগুলো একটু ফিসফিস করে, সামান্য ইঙ্গিত-ইশারা দিয়ে নিজেদের প্রয়োজনমতো পিচ বানিয়ে নেয়।
বাংলাদেশ ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পেয়েছিল। কিন্তু তার ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া তাদের দ্বিতীয় টেস্ট সিরিজ খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সেটিও অস্ট্রেলিয়ার নিয়মিত টেস্ট ভেন্যুগুলোতে নয়।
ভারতের ক্ষেত্রেও অপেক্ষার গল্পটি কম দীর্ঘ নয়। ১৯৪৭-৪৮ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরের পর দ্বিতীয় সফরের জন্য ভারতকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২০ বছর, অর্থাৎ ১৯৬৭-৬৮ পর্যন্ত। এরপর পরবর্তী সফরের জন্য আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। পরে অবশ্য সফরগুলো চার-পাঁচ বছর অন্তর হতে থাকে।
এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। টেলিভিশন সম্প্রচারের আয় অনেকটাই নির্ভর করে ভারত অস্ট্রেলিয়া সফর করছে কি না, তার ওপর। তাই পুরোনো শক্তিগুলো এখন সম্ভব হলে প্রতি বছরই ভারতকে সফরে চাইবে। এ কারণেই ‘স্প্লিট ট্যুর’-এর মতো ব্যবস্থাও দেখা যাচ্ছে; যেখানে এক বছর টেস্ট সিরিজ, পরের বছর সীমিত ওভারের সিরিজ। ফলে চার বছরের একটি সম্প্রচার-স্বত্ব চক্রে দুটি ভারত সফর রাখা সম্ভব হয়, যা সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এখন দেখার বিষয়, ম্যাচ রেফারি মেকাইয়ের পিচ সম্পর্কে কী রিপোর্ট দেন এবং কী রেটিং দেন। সাধারণত পুরোনো শক্তিগুলোর দেশের সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার একটা প্রবণতা ম্যাচ রেফারিদের মধ্যে দেখা যায়। তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দিনে শেষ হয়ে যাওয়া একই ধরনের ম্যাচের ক্ষেত্রে যেমনটা দেখা গেছে, এবারও যদি মেকাইয়ের পিচের বিরুদ্ধে কোনো নেতিবাচক রেটিং না আসে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
কিন্তু উল্টো দিকে ভারতে কোনো টেস্ট তিন দিনে শেষ হলেই শুরু হয়ে যায় নানা ধরনের নেতিবাচক প্রতিবেদন ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য; পিচ নিয়ে, বিসিসিআই নিয়ে, এমনকি ভারতীয় ক্রিকেট নিয়েও। এই দ্বিচারিতা এতটাই স্পষ্ট যে তা সত্যিই বিস্ময়কর।
সেখানেও প্রচলিত সেই অজুহাত সামনে আসবে, বিদেশি ব্যাটাররা নাকি ভালো মানের ফাস্ট বোলিং সামলানোর দক্ষতা রাখেন না। অথচ বিদেশি ব্যাটাররা যখন স্পিন খেলতে পারেন না, তখন কেউ বলেন না যে সেটি তাদের দক্ষতার ঘাটতি। তখন পিচের মধ্যেই খুঁজে বের করা হয় কোনো ‘লুকানো সমস্যা’।
এখনো সেই দীর্ঘদিনের মগজধোলাই করা ধারণা টিকে আছে যে একজন ব্যাটারকে বিচার করতে হলে তাকে দ্রুতগতির ও বাউন্সি পিচে কেমন খেলতে পারে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। অথচ স্পিন বোলিং খেলার ক্ষেত্রে যে ফুটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দুর্বলতার বিষয়টি নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন তোলা হয়।
স্পিন খেলা আসলে ব্যাটিং দক্ষতার বড় পরীক্ষা। এখানে প্রয়োজন সূক্ষ্ম ফুটওয়ার্ক, বলের লাইন বুঝে শরীরের অবস্থান পরিবর্তন এবং নরম হাতে শট খেলা। বিপরীতে দ্রুত বোলিং সামলানোর ক্ষেত্রে মূলত দুটি মৌলিক মুভমেন্ট; ফ্রন্ট ফুট অথবা ব্যাক ফুট নির্ভর করেই অনেক কিছু করা যায়।
তারপরও উপমহাদেশে সাধারণ মানের রেকর্ড থাকা অনেক ক্রিকেটারকে পুরোনো শক্তিগুলোর ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা ‘গ্রেট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, উপমহাদেশের তথাকথিত ধীরগতির পিচে তাদের ফাস্ট বোলাররা যখন উইকেট নিতে ব্যর্থ হন, তখন তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। অথচ দ্রুতগতির পিচে ব্যাটাররা রান করতে না পারলে তাদের মান নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়া হয়।
প্রতিবেদন: স্পোর্টস্টার
