
ছবিটা দেখেন।
মনে হবে বাংলাদেশ দল একটা বড় ম্যাচ জিতে গেছে। ডানপাশে ‘সিউ’ সেলিব্রেশন করতে থাকা বোলারটা উইকেট নিয়ে ম্যাচ জিতেছে, আর দলের সবাই প্রচণ্ড উল্লাসে ফেটে পড়ছে।
এই ছবিটা আসলে কী, এটা তো আপনারা অলরেডি সবাই জেনে গেছেন। গতকাল থেকেই অনেকে লিখছেন। প্রত্যেকের লেখা পড়ে এবং বর্ণনা শুনে আমারই চোখে জল ধরে রাখা দায় হয়েছে।
ঘটনাটা হচ্ছে, গতকালকে বাংলাদেশের সব পেসারকে লিটন একটা চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। উইকেটের সামনে একটা মার্ক রেখেছিলেন, সম্ভবত একটা জুতো। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- ইয়র্কার করে টানা তিনটা বল ওই জুতোটায় হিট করাতে হবে। যে প্রথম করতে পারবে, সে লিটনের কাছ থেকে একটা অর্থ পুরস্কার পাবে। সেটা পরিমাণে একেবারে কম না; বেশ কয়েকটা ১০০০ টাকার নোট দেখলাম।
মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, টানা তিনটা দুর্দান্ত ইয়র্কার করে ওই জুতায় হিট করে চ্যালেঞ্জটা জিতল মাত্রই জাতীয় দলে আসা সাকলাইন; আব্দুল গাফফার সাকলাইন।
সাকলাইন জেতার পর যে ‘সিউ’ সেলিব্রেশনটা করছে। দেখেন পাশে শামীমের উল্লাস দেখেন, বসে থাকা লিটনের মুখটা দেখেন, এপাশে নাসুমের সেলিব্রেশন দেখেন, মেহেদীর দুই হাত উচু করে ছুটে আসা দেখেন। আপনার সাকলাইনের ‘সিউ’ দেখার দরকার নাই, সবার মুখটা দেখেন। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে যে সাকলাইন এই তিনটা বল হিট করে আসলে বিশ্বজয় করে ফেলছে।
দিস ইজ ড্রেসিংরুম কালচার। ঘটনাটা নেটে ঘটছে কিন্তু এটাই আসলে সেই ড্রেসিংরুম বন্ডিং।
দল আজকে জিতছে, কালকে জিতবে না। কালকে জিতবে না, পরশু জিতবে। দল আস্তে আস্তে ধারাবাহিক হবে। পৃথিবীর কোনো দল টানা জিততে থাকে না, টানা হারতে থাকে না। কিন্তু মোরালি যদি একটা দল ভালো অবস্থায় থাকে তারা মোটামুটি ধারাবাহিকভাবে জয়ের ভিতরে থাকে।
সেই মোরালি ভালো অবস্থায় থাকার মূল শর্ত হচ্ছে এই যে একটা টিম হয়ে ওঠা। প্রত্যেকটা বাচ্চা টিমের স্টার। যে ছেলেটা এখনো অভিষেক হয়নি, ওর জন্য সবাই মিলে উল্লাস করবে—দিস ইজ টিম কালচার।
এই জিনিসটা আমাদের মিসিং ছিল জানেন? লম্বা সময় ধরে। মাশরাফি যাওয়ার পর থেকে টিমটা আস্তে আস্তে ধসতে ধসতে এমন হয়েছিল, এক সময়ে টিমের ভিতরের বর্ণনা শুনে মনটা খুব বিষন্ন হয়ে যেতো। সবাই নিজের প্র্যাকটিসটা করে বাসায় চলে যায়। খেলা হয়, ড্রেসিংরুম নীরব পড়ে থাকে; আড্ডা নেই, হইচই নেই। এভাবে টিম হয় না, হয় না।
আমি দুটো মানুষরে খুব খুব কৃতিত্ব দেব যে এই মরা ড্রেসিংরুমে এভাবে বাতি জ্বেলে দেওয়ার জন্য। একজন নাফিস ইকবাল খান। বেশ কিছুদিন ধরে ম্যানেজার হিসেবে আছে। একের পর এক টিমটারে উজ্জীবিত করার জন্য ড্রেসিংরুমটারে উজ্জীবিত করার জন্য নানা রকম উদ্যোগ নিচ্ছে।
তবে এই সবকিছুর পেছনে একজন লুকানো মানুষ আছে-ক্যাপ্টেন দাদা। লিটন দাস।
লিটন ভেতরে যে কী অসম্ভব জনপ্রিয় এই তরুণ প্রজন্মের কাছে, সেটা বাইরে থেকে কল্পনা করা কঠিন। সাকলাইন সেদিন দেখলাম এক পত্রিকায় বলছে—ক্যাপ্টেন দাদা। আমি আরেকটা জুনিয়র ক্রিকেটাকে ফোন দিলাম যে সাকলাইন এটা কী বলল? সে বললো, ‘সাকলাইন কেন, এই জেনারেশনের অনেকেই তো তারে ক্যাপ্টেন দাদা বলে।’
সাকলাইন ওই তিনটা ইয়র্কারে ‘সিউ’ সেলিব্রেশনটা যে করল তাতে ক্যাপ্টেন দাদার জয়টা দেখতে পাচ্ছি।
ক্যাপ্টেন, আপনি দলটাকে কী দিয়ে যাবেন সেটা নিয়ে আমার কোনো রকম মাথা ব্যথা নেই। দল আমাদের ভালো। আমাদের দারুন সব প্রতিভাধর বাচ্চা আছে, বিশ কোটি আবেগে থরো থরো মানুশ আছে, ছোট দেশটার জন্য অসীম মায়া আছে। এই দেশ কোনো দিন পিছায়ে পড়বে না। আমাদের দরকার শুধু এই উচ্ছাসের আলো।
কিন্তু এই যে আলোটা জ্বেলে দিয়ে গেলেন এর সুফল নিশ্চয়ই পাব। আমি আশা করি আলোটা দীর্ঘ দিন ধরে আপনি নিজেই জ্বালিয়ে রাখবেন এভাবে। ক্রিকেট যেন অন্ধকার না হয়।
আমি পরাজয় সইতে পারি; অন্ধকার পারি না।
(লিটনের জেন জি ক্রিকেটারদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার কারন নিয়ে লিখবো। আমাদের সময়ের লিডার আর জেন জি’র লিডার এক না।)
