
বাকলিয়ায় ৯০ হাজার ইয়াবা গায়েব: দায়মুক্তি পাওয়া ওসির কান্নাকাটি, সাংবাদিককে ১০ লাখ টাকা সাধার অভিযোগ ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া থানা এলাকায় গত বছরের ৮ ডিসেম্বর রাতে ৯০ হাজার পিস ইয়াবা
উদ্ধারের পর তা ‘গায়েব’ করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার
অভিযোগ থাকলেও তৎকালীন বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন
(বর্তমানে কোতোয়ালি থানার ওসি) পার পেয়ে যান। তবে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ
প্রকাশের পর এক সাংবাদিককে ফোন করে কান্নাকাটি ও ১০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব
দিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ঘটনাটি একটি নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানের সীমা ছাড়িয়ে পুলিশের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও
প্রভাব খাটিয়ে দায়মুক্তির প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
যেভাবে গায়েব হলো সোয়া ২ কোটি টাকার ইয়াবা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী,
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সোয়া দুইটার দিকে শাহ আমানত সেতু (নতুন ব্রিজ)
এলাকায় কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’–এর একটি বাসে তল্লাশি
চালায় বাকলিয়া থানা-পুলিশ। এ সময় ইমতিয়াজ হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে
পুলিশ বক্সে নেওয়া হয়। তাঁর ট্রলিব্যাগ থেকে ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়, যার
আনুমানিক বাজারমূল্য সোয়া দুই কোটি টাকা।
জিজ্ঞাসাবাদে ইমতিয়াজ নিজেকে পুলিশ কনস্টেবল এবং কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন
দমন ট্রাইব্যুনাল-২–এর বিচারকের দেহরক্ষী (গানম্যান) পরিচয় দেন। অভিযোগ
রয়েছে, এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং
উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ ইয়াবা গায়েব করে ফেলা হয়। ওই সময় ঘটনাস্থলে
দায়িত্বরত ছিলেন তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ ও সেকেন্ড
অফিসার উপপরিদর্শক (এসআই) আল-আমিনসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
ওসির নির্দেশ ও রহস্যজনক দায়মুক্তি সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তৎকালীন বাকলিয়া থানার
ওসি (বর্তমানে কোতোয়ালি থানার ওসি) আফতাব উদ্দিনের নির্দেশেই ইয়াবার চালানটি
গায়েব করে ভাগবাঁটোয়ারা করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর গত ২৩ ডিসেম্বর
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদ
স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) তদন্তের নির্দেশ দেন।
পরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অভ্যন্তরীণ তদন্তে ইয়াবা গায়েব ও
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার সত্যতা পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে
কনস্টেবল ইমতিয়াজসহ আট-নয়জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে
ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকার যুক্তি দেখিয়ে ওসি আফতাব উদ্দিন এই তদন্ত
থেকে দায়মুক্তি পেয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, সিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাসিব আজিজের
প্রভাবের কারণেই তিনি এই দায়মুক্তি পান।
সাংবাদিককে ১০ লাখ টাকা সাধার অভিযোগ সম্প্রতি ইয়াবা গায়েবের বিষয়টি আবার আলোচনায়
এসেছে। একাধিক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিপাকে
পড়েন ওসি আফতাব উদ্দিন। বিষয়টিকে অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংবাদ প্রকাশের পর এক সাংবাদিককে ফোন করে রীতিমতো
কান্নাকাটি করেন ওসি আফতাব। নিজের চাকরি ও সম্মান বাঁচাতে ওই
সাংবাদিককে ইয়াবা বিক্রির টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
জানা গেছে, ওই ফোনালাপের অডিও রেকর্ড শীঘ্রই প্রকাশ করা হবে ।
রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এবং প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায়
পার পেয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
উঠেছে। অডিও রেকর্ড প্রকাশের পর সিএমপি সদর দপ্তর অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে কী
আইনি ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
