
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে স্বামী ফোরকান মোল্লার হাতে খুন হয়েছেন গৃহবধূ শারমিন আক্তার। গত ৮ মে দিবাগত রাতে এই ঘটনায় শারমিনের তিন সন্তান ও এক ভাইও নিহত হন। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে ও নির্যাতনের পরও সন্তানদের কথা ভেবে সংসার টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারাতে হয়েছে তাঁকে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, শারমিনের মতো আরও অনেক নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হচ্ছেন। নারীরা পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করলেও বাস্তবে পরিবারের সদস্যদের হাতেই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে স্বামী, স্বামীর পরিবার ও নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে ১ হাজার ৫৬৫ জন নারী নিহত হয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি।
সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতায় নারীদের হত্যার ঘটনাগুলো হঠাৎ ঘটে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন ভুক্তভোগীরা। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক নারী নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
শারমিনের স্বজনেরা জানান, ছয়-সাত মাস আগে স্বামীর মারধরের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। এরপরও তিনি স্বামীর সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন। এই পাঁচ হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফোরকান মোল্লার মরদেহ গত ১৬ মে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর পলাতক অবস্থায় তিনি পদ্মা সেতু থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪ জন নারী। এ সময়ে স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন ২৭৩ জন এবং নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ১ হাজার ৫৬৫ নারীর।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসে স্বামীর হাতে নিহত হয়েছেন ৫৬ নারী। একই সময়ে নিজ পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন ২১ জন এবং স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন আরও আটজন। অর্থাৎ, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৭৯ নারী।
নারী অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যার পেছনে যৌতুক, পারিবারিক কলহ, পরকীয়ার সন্দেহ, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা এবং নারীর স্বাধীন চলাফেরায় বাধার বিষয়গুলো বেশি দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবারকে নিরাপদ মনে করা হলেও নারীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা ঘটে ঘরের ভেতরেই। শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউই এ সহিংসতার বাইরে নন। অনেক নারী দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হলেও সামাজিক চাপ, পরিবার হারানোর ভয় ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আইনি সহায়তা নেন না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাও এ পরিস্থিতির একটি বড় কারণ। যেসব নারী পুরোপুরি পরিবার বা স্বামীর ওপর নির্ভরশীল, তাঁরা নির্যাতনের বিরুদ্ধে সহজে দাঁড়াতে পারেন না। ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ, ২০২৪’ অনুযায়ী, প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা জীবনসঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতা এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ। তিনজনের মধ্যে দুজন কখনোই এসব সহিংসতার কথা প্রকাশ করেননি।
আসক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টসহ (ব্লাস্ট) বিভিন্ন সংগঠন পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনগুলোর মতে, শুধু আইন করলেই হবে না, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু নারীর নয়। সহিংসতা সহ্য করাকে পারিবারিক মূল্যবোধ হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ না হলে এ ধরনের ঘটনা কমবে না। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পারিবারিক সহিংসতার অনেক ঘটনাকে শুরুতে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। স্বামীর মারধর, মানসিক নির্যাতন বা শ্বশুরবাড়ির চাপকে অনেক পরিবার ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে মেনে নেয়। সামাজিক লজ্জা, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও আর্থিক নির্ভরতার কারণে নারীরা অনেক সময় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। ফলে সহিংসতা ধীরে ধীরে চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তাঁর মতে, নারীর প্রতি নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং বিচারহীনতা এসব ঘটনার বড় কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম্পত্য সম্পর্কে অসততা, অবিশ্বাস ও মাদকাসক্তি এখন বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যা সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক মানুষ মানসিক চাপ ও রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, ঋণের চাপ, পারিবারিক অশান্তি ও ব্যক্তিগত ব্যর্থতা থেকে তৈরি হতাশা অনেক সময় পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর প্রভাব ফেলে। সমাজে নারীদের তুলনামূলক দুর্বল ও সহজ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের মতে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনো কম। বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা আচরণগত সমস্যায় ভুগলেও অধিকাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন না। বরং বিষয়গুলোকে ‘সংসারের ঝামেলা’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। এতে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও হতাশা একসময় সহিংসতায় রূপ নেয়।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাওয়াও এ ধরনের ঘটনার একটি কারণ। আগে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটাতেন এবং সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। এখন ব্যস্ততা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের কারণে সেই যোগাযোগ কমেছে। ফলে ছোট বিরোধও দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
