
আমরা প্রতিদিন শূন্য শব্দটি ব্যবহার করি। খালি বোতলকে বলি শূন্য, খালি ঘরকে বলি ফাঁকা, মহাশূন্যকে কল্পনা করি এক বিশাল শুনশান অন্ধকার হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলোঃ “যাকে আমরা শূন্য বলি, সেটি কি সত্যিই সম্পূর্ণ শূন্য?”
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। সাধারণভাবে আমরা মনে করি শূন্যতা মানে এমন একটি স্থান যেখানে কিছুই নেই না পদার্থ, না শক্তি, না আলো, না কোনো কণা। অর্থাৎ একেবারে ফাঁকা।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ শূন্যতাকে এভাবেই কল্পনা করেছে। কিন্তু বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, ততই দেখা গেছে বাস্তবতা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি রহস্যময়।
মহাশূন্যও পুরোপুরি ফাঁকা নয়
পৃথিবীর বাইরে বিশাল মহাকাশকে আমরা প্রায়ই শূন্য স্থান বলি। কিন্তু বাস্তবে সেখানে গ্যাসের অণু, ধূলিকণা, বিকিরণ, মহাজাগতিক রশ্মি এবং বিভিন্ন ধরনের ক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে।
এমনকি গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যবর্তী বিরাট ফাঁকা অঞ্চলগুলোতেও কিছু না কিছু পদার্থ ও শক্তি উপস্থিত থাকে। অর্থাৎ মহাবিশ্বে আমরা যত দূরেই তাকাই না কেন, সম্পূর্ণ ফাঁকা কোনো স্থান এখনো খুঁজে পাইনি।
ল্যাবরেটরিতে কি শূন্যতা তৈরি করা যায়? বিজ্ঞানীরা অত্যাধুনিক ভ্যাকুয়াম চেম্বার ব্যবহার করে বাতাসের প্রায় সব অণু সরিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু তবুও সেখানে কিছু কণা থেকে যায়। কারণ শতভাগ কণামুক্ত পরিবেশ তৈরি করা কার্যত অসম্ভব। কোনো না কোনো কণা, বিকিরণ বা শক্তি সবসময় উপস্থিত থাকে।
তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় আসে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান থেকে। একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, সব কণা সরিয়ে দিলে অবশেষে সত্যিকারের শূন্যতা পাওয়া যাবে। কিন্তু কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব সেই ধারণা বদলে দেয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মৌলিক ক্ষেত্র সর্বত্র বিদ্যমান। ইলেকট্রন ক্ষেত্র, ফোটন ক্ষেত্র, কোয়ার্ক ক্ষেত্র এসব ক্ষেত্র কখনো পুরোপুরি অদৃশ্য হয় না।
ফলে কোনো স্থানে দৃশ্যমান কণা না থাকলেও সেই স্থান সম্পূর্ণ খালি নয়। বরং সেখানে ক্রমাগত ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম ওঠানামা ঘটতে থাকে।
শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও কোয়ান্টাম জগতে তথাকথিত খালি স্থান থেকে ক্ষণিকের জন্য কণা ও প্রতিকণা জোড়া সৃষ্টি হতে পারে এবং মুহূর্তের মধ্যেই আবার বিলীন হয়ে যেতে পারে।
এগুলোকে বলা হয় ভার্চুয়াল কণা। অর্থাৎ যে স্থানকে আমরা ফাঁকা ভাবছি, তার গভীর স্তরে অবিরাম কার্যকলাপ চলতে পারে। শূন্যতা এখানে নিস্তব্ধ নয়; বরং এক ধরনের অদৃশ্য গতিশীল অবস্থা।
তাহলে কিছুই নেই বলতে কী বোঝায়? এখানেই বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। বিজ্ঞান যে শূন্যতা নিয়ে আলোচনা করে, তা হলো ভ্যাকুয়াম যেখানে পদার্থ নেই, কিন্তু ক্ষেত্র ও কোয়ান্টাম শক্তি থাকতে পারে।
অন্যদিকে দর্শনের পরম শূন্যতা বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থা যেখানে একেবারেই কিছু নেই। না স্থান, না সময়, না শক্তি, না কোনো নিয়ম। আর এমন অবস্থার অস্তিত্ব সম্পর্কে বিজ্ঞানের কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।
আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে যে প্রকৃতি শূন্যতাকেও পুরোপুরি শূন্য থাকতে দেয় না। যেখানে আমরা ফাঁকা স্থান দেখি, সেখানে ক্ষেত্র আছে। যেখানে কোনো কণা নেই, সেখানে কোয়ান্টাম ওঠানামা আছে। যেখানে নীরবতা মনে হয়, সেখানে অদৃশ্য কার্যকলাপ চলছে।
হয়তো এ কারণেই মহাবিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ মনে হওয়া প্রশ্নগুলোর একটি “শূন্যতা কী?” যেটা আজও বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর রহস্যগুলোর মধ্যে একটি।
প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ শূন্যতা বা কিছুই নেই এমন অবস্থার অস্তিত্ব এখনো পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। মহাশূন্যের গভীরতম অঞ্চল থেকে শুরু করে পরীক্ষাগারের উন্নততম ভ্যাকুয়াম পর্যন্ত সব জায়গাতেই কোনো না কোনো রূপে ক্ষেত্র, শক্তি বা কোয়ান্টাম কার্যকলাপ উপস্থিত থাকে।
তাই আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে বলা যায় শূন্যতা আসলে যতটা ফাঁকা মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। মহাবিশ্বের নীরবতম স্থানও সম্পূর্ণ নীরব নয়।
