
এটিকে শুধুমাত্র একটি ঘটনা বলা যাবে না। এটি পৃথিবীর নৃশংসতম আচরণের একটি। যে শিশুটি এখনও পৃথিবী বোঝেনি, বয়স মাত্র ১১ বছর, মাসিক হয়তো সবে শুরু হয়েছে, কিন্তু তার পেটেই এসেছে আরেক সন্তান। এখনও তার চোখে-মুখে শৈশবের ঘ্রাণ, কিন্তু সেখানে এখন কেবল ভয়। সে কিছুই জানত না। তার পেট কেন বড় হয়ে যাচ্ছে, কেন তার শরীরে পরিবর্তন ঘটছে—কিছুই সে বোঝে না। আশেপাশের অন্য কেউই ধারণা করতে পারেনি যে, এই শিশুটির পেটেই বড় হচ্ছে আরেকটি শিশু। এই ১১ বছরের মেয়েটি পড়াশোনা করত নেত্রকোণার মদন উপজেলার একটি কওমি মাদ্রাসায়, প্রথম শ্রেণি অতিক্রম করে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, মেয়েটির মা সিলেটে অন্যের বাসায় কাজ করতেন এবং মেয়েটি থাকত নানাবাড়িতে। বাবা চলে গেছেন। মা সিলেট থেকে এসে মেয়েকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। ছোট্ট মেয়েটি প্রথমে বলতেও পারে না কী হয়েছে তার। জানায়, তার পেট ভার ভার লাগে; কী যেন হঠাৎ নড়াচড়া করে। তারপর চিকিৎসক যখন মেয়েটির রোগ জানতে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করান, তখন দেখা গেল মেয়েটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে যে, মেয়েটির উচ্চতা, ওজন এবং শারীরিক গঠন বাচ্চা প্রসবের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মেয়েটির ওজনই হলো ৩০ কেজি।
প্রথম সেই চিকিৎসকের ফেইসবুক পোস্টের মাধ্যমে ঘটনাটি আলোচনায় আসে। আমি জানি, নিশ্চিতভাবেই জানি, সেই চিকিৎসক সেই দিনের পর থেকে সেই রাত কেন, অনেক রাতেই হয়তো ঘুমাতে পারেননি। তার কানে বাজছে সেই ছোট্ট মেয়েটির কথা—‘পেট ভার ভার লাগে, কী যেন হঠাৎ নড়াচড়া করে।’ তিনি শুধু চোখের সামনে দেখতে পান একটি শিশু আরেকটি শিশুকে পেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর বলছে, ‘কী যেন নড়ছে’। আহা, সেই ছোট্ট মেয়েটির কোনো ধারণাই নেই কী নড়ছে তার পেটে! পরে সংবাদমাধ্যমে সেটি আরও বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়। ঝুঁটি বেঁধে মাদ্রাসায় যাওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি এখন ভারী একটি দ্বৈত জীবন বয়ে বেড়াচ্ছে। যিনি মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছেন তিনি অপরিচিত কেউ নন, সেই মাদ্রাসার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি—মেয়েটির ভাষায় ‘হুজুর’। মেয়েটির মা মামলা দায়ের করেছেন আর সেই হুজুর আত্মগোপন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, আত্মগোপন অবস্থায় ভিডিও বার্তা দিয়েছেন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে। তবে তাকে এখন গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এটি কোনো ভুলে যাওয়ার মতো সংবাদ নয়, বরং এক হৃদয়বিদীর্ণ করা খবর। খবরটি পত্রিকায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে পড়ছিল নীলিমা ইব্রাহিমের লেখা ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’-তে ফ্রক পরা ছোট্ট মেয়ে মর্জিনার কথা। মর্জিনার বয়স তখন ১২ বছর। ফ্রক পরে মর্জিনা ঘুরছে আর তার ছেলেকে দেখছে—কখনও খেলছে, কখনও হাসছে। এমন দৃশ্য মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পরও দেখতে হবে, তা কেউ ভাবেনি। তখন মর্জিনাকে ধর্ষণ করেছিল পাকিস্তানি সেনারা আর এখানে ‘হুজুর’।
তিন বছরের কন্যা শিশু থেকে ৬০ বছরের বৃদ্ধ নারী—ধর্ষণ সবই হয় এই বাংলাদেশে। আরও অবাক করার বিষয় হলো, মাঝেমধ্যেই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় আরও কিছু সংবাদ—মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর রাস্তায় প্রসব বেদনা শুরু হলে কোনো ব্যক্তি বা পুলিশের কেউ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন; বাচ্চার জন্য নতুন কাপড়-চোপড় নিয়ে গিয়ে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি বড় কাজ। কিন্তু আজ পর্যন্ত যেটি দেখা গেল না, সেটি হলো—কে বা কারা এই নারীকে ধর্ষণ করেছে সেটি বের করার তাগাদা তৈরি করা। এই ধর্ষক যে কেউই হতে পারে। এই রাষ্ট্রে মানসিক ভারসাম্যহীন নারীও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন এবং তাকে ধর্ষণ করা অনেক বেশি নিরাপদ ধর্ষকের কাছে। কারণ সে জানে, এই সমাজ এই ধর্ষণ নিয়ে কথা বলবে না এবং মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর বক্তব্য আমলে নেবে না। আর এই ধরনের খামতিগুলোই কাজে লাগায় ধর্ষকেরা।
ঠিক একই কথা বলা চলে শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রেও। কারণ ধর্ষকেরা জানে যে, বেশিরভাগ শিশু ধর্ষণ বুঝতে পারে না এবং তারা এটি সঠিকভাবে কারো কাছে বর্ণনা করতে পারে না। যার কারণে তারা ‘ব্যথা দিচ্ছে’ বা ‘ব্যথা পাচ্ছি’ বললেও পরিবার বা আত্মীয়-স্বজন সেটি যে ধর্ষণ হতে পারে, তা আন্দাজ করতে পারে না। যার ফলে এটি আর প্রকাশিত হয় না। অনেক সময় শিশুদের কথায় পরিবার খুব বেশি মনোযোগও দেয় না। এর পাশাপাশি ধর্ষক যদি পরিচিত গণ্ডির কেউ হয়, তখন সেটি প্রকাশ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছিলাম যে, কন্যা শিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষক বেশিরভাগই পরিচিত (আত্মীয়, স্কুল কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষক, প্রতিবেশী)। যার কারণে এগুলো নিয়ে আলোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফিসফিসানি হলে সেটি নিজেদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে হলের দু-পক্ষের ‘ইজ্জত’ রক্ষার বন্দোবস্ত করা হয়। আর ‘হুজুর’ হলে আরও বড় ধরনের ফতোয়া পড়ে। তারা জেনে যায় যে, তাদের বিরুদ্ধে সমাজ-সংস্কারের আঙুল তোলা অত সহজ নয়, কারণ ধর্মের মলম তাদের কাছে আছে। ধর্ষক জানে মেয়েটির পারিবারিক অবস্থা। সাধারণত তারা যখন বোঝে যে ধর্ষণের শিকার নারীর পরিবারের পক্ষে এর প্রতিবাদ বা বিচার চাওয়ার সুযোগ কম, তখন সমস্ত কিছু তার পক্ষেই যায়। কন্যা শিশুকে ধর্ষণের ক্ষেত্রে এই ধরনের মনস্তত্ত্ব কাজ করে।
১১ বছরের বাচ্চা মেয়েটির ক্ষেত্রেও হয়তো তাই ঘটত যদি স্বয়ং চিকিৎসক সেটিকে সামনে না আনতেন। মেয়েটির মা-ও হয়তো মামলা করার সাহস পেতেন না। অন্যদিকে, এই বিষয়টি প্রকাশ করার জন্য সেই চিকিৎসকও নানা ধরনের হুমকি পাচ্ছেন বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানতে পাচ্ছি। অভিযুক্ত হুজুর ধরা পড়েছেন। তিনি হয়তো অল্প কিছুদিন পরেই জামিন পেয়ে যাবেন। ধর্ষণ মামলা জামিনযোগ্য নয়, কিন্তু জামিন হয়। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর হয়তো তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হবে। কারণ বছর খানেক আগেও আমরা শাহবাগ থানাতেই যৌন নিপীড়ককে মুক্ত করার জন্য মব করতে দেখেছি, ফুলের মালা দিয়ে বরণ করতে দেখেছি। তারপর অন্যসব জামিন পাওয়া ধর্ষকের মতো তার এবং তার পরিবারের প্রথম কাজ হবে সেই মেয়েটি এবং তার পরিবারকে এলাকাছাড়া করা, নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নেওয়া। দিন এনে দিন খাওয়া সেই মা-ও দমে যাবেন। কারণ তখন তার প্রথম কাজ হয়তো হয়ে দাঁড়াবে এই ১১ বছরের মেয়েটিকে বাচ্চাসহ এই সমাজের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাঁচিয়ে রাখা।
মেয়েটির পেটে বাচ্চা নড়ছে, কিন্তু রাষ্ট্রের নড়াচড়া নেই—আছে হয়তো শুধু গ্রেপ্তার পর্যন্ত। তারপর? সরকার হাসিমুখে জানান দেবে আসামি ধরা পড়েছে। এখানেই হয়তো শেষ, কিন্তু শেষ হবে না এই মেয়েটির বেঁচে থাকার লড়াই। ‘পেট ভারী লাগে, কী জানি নড়াচড়া করে’—এরপর জীবন ভারী লাগবে। আরও জীবনটিকে কোথায় রাখবে সেটি নিয়েই নড়াচড়া, বেদনা, ভয়, আক্রমণ। সমাজ-রাষ্ট্রের বিপরীতে কতটুকু দাঁড়াতে পারবে সে? আর অন্যদিকে ধর্ষকরা আরও তাগড়া হয় অন্য জীবন নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এদের ক্ষমা নেই—কিন্তু এরা রাষ্ট্রের ক্ষমা পেয়ে যায়, আমার-আপনার বদৌলতেই।
