
জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো দুই পরাশক্তির অপ্রত্যাশিত বিদায়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জমে উঠেছে শিরোপার লড়াই। রাউন্ড অব ৩২’র খেলা শেষ হওয়ার পর বদলে গেছে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের হিসাব-নিকাশও। পারফরম্যান্স, দলীয় ভারসাম্য, বর্তমান ফর্ম এবং সামনে সম্ভাব্য পথ সবকিছু বিবেচনায় নতুন একটি পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ে ফ্রান্সকে রাখা হয়েছে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবে। তাদের ঠিক পরেই রয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তৃতীয় স্থানে আছে ব্রাজিল।
শেষ ষোলোর লড়াইয়ে কানাডাকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে মরক্কো। অন্যদিকে প্যারাগুয়েকে বিদায় করে এগিয়েছে ফ্রান্স। এই ফলগুলোর পর বিশ্বকাপের শেষ আটের লড়াই আরও জমে উঠেছে।
শিরোপাজয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছে ফ্রান্সকে। দলটির আক্রমণভাগ টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর ফুটবল খেলছে। সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি গোল করার দক্ষতাও অন্যদের তুলনায় বেশি। বড় ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন এমন একাধিক তারকা ফুটবলার এবং বিশ্বকাপজয়ী অভিজ্ঞতার কারণে ফরাসিরা এখন অনেকের চোখে শিরোপার প্রধান দাবিদার।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা। দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের জয়ের মানসিকতা। কঠিন পরিস্থিতিতেও কীভাবে ম্যাচ নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে হয়, সেটি তারা বারবার দেখিয়েছে। অভিজ্ঞ লিওনেল মেসির উপস্থিতি এখনো দলটিকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন জয়ের পর আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তৃতীয় স্থানে থাকা ব্রাজিলের সাফল্যের বড় ভিত্তি তাদের রক্ষণভাগ। মারকুইনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসের জুটি, সঙ্গে মাঝমাঠে কাসেমিরোর অভিজ্ঞতা দলটিকে ভারসাম্য দিয়েছে। আক্রমণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি ও ড্রিবলিং যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে পারে।
স্পেন রয়েছে চতুর্থ স্থানে। গ্রুপ পর্বে কিছুটা ছন্দহীন থাকলেও নকআউটে এসে তারা নিজেদের সেরাটা দেখাতে শুরু করেছে। লামিন ইয়ামাল পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফেরায় স্প্যানিশদের আক্রমণভাগ আরও শক্তিশালী হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই দলটির সেমিফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল।
পঞ্চম স্থানে ইংল্যান্ড। অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে ঘিরে গড়া দলটিতে রয়েছে একাধিক গতিময় উইঙ্গার ও সৃজনশীল আক্রমণভাগ। কঙ্গোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ ঘুরিয়ে জেতার ক্ষমতা তাদের মানসিক দৃঢ়তারই প্রমাণ।
একসময় শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচিত পর্তুগাল এবার নেমে এসেছে ষষ্ঠ স্থানে। দলটির খেলায় ধারাবাহিকতা নেই। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো গোল পেলেও আগের মতো প্রভাব ফেলতে পারছেন না। ব্রুনো ফার্নান্দেজও নিজের সেরা ছন্দে নেই। ফলে কোচ রবার্তো মার্টিনেজের দলকে এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপে দেখা যায়নি।
সপ্তম স্থানে থাকা কলম্বিয়া নীরবে দুর্দান্ত একটি টুর্নামেন্ট খেলছে। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি তারা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল উপহার দিয়েছে। তবে তাদের সম্ভাব্য পথে আর্জেন্টিনা থাকায় কাজটা সহজ হবে না।
অষ্টম স্থানে রয়েছে মরক্কো। গত কয়েক বছরে আফ্রিকার সবচেয়ে ধারাবাহিক দলটি নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সমন্বয়ে গড়া দলটি যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্যই কঠিন চ্যালেঞ্জ।
নবম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনোর অধীনে দলটি এখন অনেক বেশি সংগঠিত। দ্রুতগতির আক্রমণ, বল দখলে দক্ষতা এবং নিচ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার কৌশল তাদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।
দশম স্থানে নরওয়ে। মার্টিন ওডেগার্ড, আলেকজান্ডার সোরলথ ও আর্লিং হালান্ডকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ যেকোনো প্রতিরক্ষার জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে সেট-পিস ও আকাশপথের খেলায় তারা বিপজ্জনক।
বেলজিয়াম রয়েছে একাদশ স্থানে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও এবার তারা নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে ভিন্ন পরিচয় গড়ার চেষ্টা করছে। লিয়ান্দ্রো ট্রসার্ড ও ইউরি টিলেমান্সের নেতৃত্বে দলটি নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
দ্বাদশ স্থানে সুইজারল্যান্ড। ব্রিল এমবোলোর গোল করার ক্ষমতা তাদের বড় শক্তি। তবে বিশ্বকাপ জয়ের মতো গভীরতা ও অভিজ্ঞতা এখনো দলটির নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ স্থানে থাকা মেক্সিকো শেষ ম্যাচে নিজেদের পারফরম্যান্সে উন্নতির ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে পরবর্তী ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় নিজেদের পরিচিত উচ্চভূমির সুবিধা আর পাবে না তারা। সামনে ইংল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষও অপেক্ষা করছে।
তালিকার শেষ দল মিশর। মোহাম্মদ সালাহ ও ওমর মারমুশকে ঘিরে গড়া দলটি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলেতে জায়গা করে নিয়েছে। যেখানে তাদের সামনে রয়েছে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে হারানোর চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বকাপ এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে ছোট একটি ভুলই শেষ করে দিতে পারে চার বছরের স্বপ্ন। তাই কাগজে-কলমে ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও নকআউট ফুটবলে চমকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। শেষ আটের লড়াইই বলে দেবে, পাওয়ার র্যাঙ্কিংয়ের পূর্বাভাস কতটা বাস্তবে রূপ নেয়।
