
রাজধানীর পল্লবীতে এক বৃদ্ধা মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। এমন ঘটনা ঘটলেই সাধারণত সমাজের একটি বড় অংশ সন্তানের দিকে আঙুল তোলে। প্রশ্ন ওঠে—কীভাবে একজন ছেলে বা মেয়ে নিজের মা-বাবাকে এমন পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে?
তবে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ—একজন মানুষকে ভালোবাসতে, মায়া করতে এবং সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শেখানো হয়েছিল কি?
শৈশব থেকেই আমাদের সমাজে অধিকাংশ শিশুর বেড়ে ওঠা হয় প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে। পরীক্ষার নম্বর, ক্লাসে অবস্থান, অন্যের সঙ্গে তুলনা—এসবই হয়ে ওঠে তাদের পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি। অনেক পরিবারে সন্তানের অনুভূতি, স্বপ্ন কিংবা মানসিক অবস্থার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ফলাফল ও অর্জন।অনেক তরুণ-তরুণীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ছোটবেলা থেকে তারা শুনেছে—”রেজাল্ট কত?”, “অমুকের চেয়ে পিছিয়ে কেন?”, “সময় নষ্ট করছ কেন?”। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তারা শুনেছে—”তুমি কেমন আছ?”।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশু জন্মগতভাবেই সহানুভূতি, মমতা এবং ভালোবাসার প্রবণতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। একটি ছোট শিশু যেমন সহজেই পাখি, প্রাণী বা অন্য শিশুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, তেমনি স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রতি মায়া অনুভব করে। কিন্তু বড় হওয়ার পথে সেই অনুভূতিগুলো যদি বারবার দমন করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে আবেগের জায়গা সংকুচিত হতে শুরু করে।
অনেক পরিবারে শিশুদের প্রাণীর প্রতি মমতা নয়, বরং ভয় বা ঘৃণা শেখানো হয়। আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্কের বদলে শেখানো হয় প্রতিযোগিতা। বন্ধুর সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার পরিবর্তে জন্ম নেয় তুলনা ও ঈর্ষা। ফলাফল হিসেবে শিশুর আবেগিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একটি শিশুকে দীর্ঘদিন শুধু সাফল্যের যন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়, তখন সে ধীরে ধীরে সম্পর্কের চেয়ে অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে। পরবর্তীতে সেই মানুষটির কাছ থেকেই পরিবার নিঃশর্ত ভালোবাসা প্রত্যাশা করে। কিন্তু যে আবেগের চর্চা কখনো হয়নি, তা হঠাৎ করে প্রকাশ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
সন্তানের অবহেলার ঘটনাগুলো তাই সব সময় একপাক্ষিকভাবে বিচার করা যায় না। এর পেছনে অনেক সময় দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক, মানসিক দূরত্ব এবং আবেগিক শিক্ষার ঘাটতি কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের শুধু গণিত, বিজ্ঞান বা ভাষা শিক্ষা দিলেই যথেষ্ট নয়। তাদের সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার শিক্ষাও দিতে হবে। একটি ফুলকে ভালোবাসা, একটি ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দেওয়া, বন্ধুর সাফল্যে আনন্দ পাওয়া কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই গড়ে ওঠে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থ, পদ বা সাফল্য নয়; বরং সম্পর্ক, মমতা এবং ভালোবাসা। যে পরিবার ভালোবাসার বীজ বপন করে, ভবিষ্যতে সেই পরিবারই ভালোবাসার ফল ভোগ করার সম্ভাবনা বেশি রাখে।
সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, পৃথিবী অনেকটা আয়নার মতো। এখানে ঘৃণা ছড়ালে ঘৃণাই ফিরে আসে, আর ভালোবাসা দিলে একদিন না একদিন ভালোবাসাও ফিরে আসে।
তাই আগামী প্রজন্মকে শুধু সফল নয়, মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন তারা। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পারেন—ভালোবাসার বিকল্প আসলে কিছুই নেই।
