
নিজের ভুল ও দোষত্রুটি চিহ্নিত করে তা সংশোধন করা আত্মশুদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ইমাম ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি (রহ.) তাঁর ‘মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন’ গ্রন্থে নিজের দোষত্রুটি জানার চারটি উপায় উল্লেখ করেছেন।
১. অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান আলেমের সান্নিধ্য এমন একজন জ্ঞানী, অভিজ্ঞ ও দ্বিনদার শাইখ বা মুরব্বির সান্নিধ্যে থাকা উচিত, যিনি মানুষের আত্মিক রোগ ও চরিত্রের দুর্বলতা সম্পর্কে অভিজ্ঞ। তিনি ব্যক্তির ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংশোধনের পথ দেখাতে পারেন।
বর্তমান সময়ে এমন যোগ্য মানুষ পাওয়া কঠিন। তাই কেউ যদি এমন একজন শিক্ষক বা মুরব্বির সান্নিধ্য লাভ করেন, তাহলে তাকে একজন দক্ষ চিকিৎসক পাওয়ার মতো নিয়ামত মনে করা উচিত।
২. সত্যবাদী ও দ্বিনদার বন্ধুর পরামর্শ নেওয়া এমন একজন আন্তরিক, বিচক্ষণ ও ধার্মিক বন্ধুকে নিজের সমালোচক হিসেবে বেছে নেওয়া উচিত, যিনি প্রয়োজন হলে নির্দ্বিধায় নিজের ভুল ও দুর্বলতাগুলো জানিয়ে দেবেন।
প্রকৃত বন্ধু শুধু প্রশংসা করেন না; বরং ভুল দেখলে সংশোধনের জন্য সতর্ক করেন।
৩. সমালোচকের কথাতেও নিজের ভুল খোঁজা অনেক সময় কাছের মানুষ বা বন্ধুরা ভালোবাসার কারণে আমাদের কিছু ত্রুটি প্রকাশ করেন না। কিন্তু সমালোচক কিংবা শত্রু কখনো কখনো এমন দুর্বলতাও সামনে আনতে পারেন, যা অন্যরা এড়িয়ে যান।
তাই সমালোচনা শুনলেই তা প্রত্যাখ্যান না করে কথার মধ্যে নিজের কোনো বাস্তব ভুল আছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত।
৪. মানুষের সঙ্গে মিশে শিক্ষা নেওয়া সমাজে চলাফেরার সময় অন্য মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণ করাও আত্মসংস্কারের একটি কার্যকর মাধ্যম। কারও কোনো আচরণ নিন্দনীয় বা ক্ষতিকর মনে হলে তা নিজের চরিত্রে যেন না আসে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।
অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের জীবন সংশোধন করাও আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আত্মসংস্কারের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিজের দোষত্রুটি চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেগুলো সংশোধনের জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হয়। ইসলামী শিক্ষার আলোকে আত্মসংস্কারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো—
১. অন্তরের সংশোধন আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ হলো হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শরীরে এমন একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, যা ভালো থাকলে পুরো শরীর ভালো থাকে এবং তা নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। সেটি হলো হৃদয়। (সহিহ বুখারি)
তাই ঈমান, নিয়ত ও অন্তরের অবস্থার প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া জরুরি।
২. চরিত্র ও আচরণ সুন্দর করা শুধু অন্তর ভালো রাখাই যথেষ্ট নয়; মানুষের কথা, আচরণ ও চরিত্রেও তার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, তবে জান্নাতই হবে তার আশ্রয়।’ (সুরা নাজিআত, আয়াত ৪০-৪১)
নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং উত্তম চরিত্র অর্জন করা তাই একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নেক কাজে অভ্যস্ত করা হৃদয় ও চরিত্রের প্রভাব মানুষের কর্মের মধ্যেই প্রকাশ পায়। তাই চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পাসহ প্রতিটি অঙ্গকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে সেগুলো আল্লাহর আনুগত্য ও কল্যাণকর কাজে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ করে জিহ্বা ও দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অসংযত কথা ও নিষিদ্ধ দৃষ্টি মানুষের অন্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
৪. সমাজে কল্যাণকর ভূমিকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা একজন মুসলিমের জীবন শুধু খাওয়া, ঘুমানো ও পার্থিব প্রয়োজন পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখাও তার দায়িত্বের অংশ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎ কাজ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা হজ, আয়াত ৭৭)
অন্যের দোষ নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে নিজের সংশোধনে মনোযোগ দেওয়া উচিত। অন্যের বিষয় নিয়ে শুধু ততটুকুই ব্যস্ত হন, যতটুকু আল্লাহ আপনার ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন। ড. মুস্তাফা আস-সিবাঈ (রহ) তাঁর ‘এভাবেই জীবন আমাকে শিক্ষা দিয়েছে’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যখন তোমার নফস কোনো গুনাহের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন তাকে প্রথমে আল্লাহর কথা স্মরণ করাও। যদি সে ফিরে আসে, তবে আল্লাহর প্রশংসা করো।
যদি না ফিরে আসে, তবে তাকে সম্মানিত মানুষের চরিত্রের কথা স্মরণ করাও। যদি তাতেও না ফিরে আসে, তবে মানুষের সামনে লাঞ্ছিত হওয়ার কথা স্মরণ করাও। যদি তাতেও না ফিরে আসে, তবে জেনে রাখো—সে নফস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা পশুসুলভ প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে গেছে।’
এ কথার উদ্দেশ্য মানুষকে অপমান করা নয়; বরং বোঝানো যে যখন মানুষ বিবেক, ঈমান, উত্তম চরিত্র এবং সামাজিক লজ্জাবোধ—সব ধরনের নৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন সে শুধু প্রবৃত্তির অনুসরণে চলতে শুরু করে। ইসলাম মানুষকে এ অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে আত্মসংযম, তাকওয়া ও নৈতিক উন্নতির দিকে আহবান জানায়।
স্মরণ রাখুন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নফস (মানুষের প্রবৃত্তি) মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৩)
যদি আপনার নফস আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিরত রাখতে চায়, তবে তাকে পাপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করুন। নিজের নফসের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মতো আর কিছু নেই। জিহ্বা ও দৃষ্টির চেয়ে সংযমে রাখার মতো আর কোনো অঙ্গও নেই। এগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে তারা আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে না যায়।
স্মরণ রাখুন, আপনি কি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তাঁর রহমতের আশা করতে পারেন? আল্লাহর নাফরমানি করে তাঁর জান্নাতের আশা করা উচিত নয়।
মনে রাখুন, এক দিন অবশ্যই আপনাকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। যেমন কর্ম করবেন, তেমনি প্রতিফল পাবেন। প্রতিদান কর্মেরই অনুরূপ হয়। আর মহান আল্লাহ কারো প্রতি সামান্যও অবিচার করেন না।
মনে রাখুন, কত সাময়িক কামনা-বাসনা মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী অপমানের কারণ হয়েছে! কত গুনাহ এমন হয়েছে, যার কারণে একজন মানুষ বছরের পর বছর তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে! কত নিষিদ্ধ দৃষ্টি এমন হয়েছে, যা মানুষের অন্তর্দৃষ্টির (বাসিরাহ) নুর কেড়ে নিয়েছে!
গুনাহের সবচেয়ে বড় শাস্তি গুনাহের সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি হলো ইবাদতের মাধুর্য থেকে বঞ্চিত হওয়া। অনেক সময় মানুষ তা অনুভবই করে না। এর কারণ হতে পারে—অন্তর্দৃষ্টির দুর্বলতা, ঈমানের দুর্বলতা অথবা হৃদয়ের কঠোরতা।
ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ) একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বনি ইসরাঈলের এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! আমি কতবার আপনার অবাধ্য হই, অথচ আপনি আমাকে শাস্তি দেন না!’ তখন তাকে বলা হলো, ‘আমি তো তোমাকে বহুবার শাস্তি দিয়েছি, কিন্তু তুমি তা বুঝতে পারনি। আমি কি তোমাকে আমার সঙ্গে একান্ত কথোপকথনের (মোনাজাতের) মাধুর্য থেকে বঞ্চিত করিনি?’ (সাইদুল খাতির, পৃষ্ঠা-৬৫)
পরিশেষে আত্মশুদ্ধি এক দিনের কাজ নয়; এটি সারা জীবনের সাধনা। যে ব্যক্তি নিজের দোষ চিনতে শেখে, আন্তরিকভাবে তাওবা করে, হৃদয় ও চরিত্রকে সুন্দর করে এবং সমাজে কল্যাণের জন্য কাজ করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে আত্মসংস্কারের পথে অগ্রসর হয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্যের ত্রুটি অনুসন্ধানের আগে নিজের হৃদয়, চরিত্র ও কর্ম সংশোধন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
