
বিশ শতকের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের নাম শুধু একটি দেশ বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা হয়ে উঠেছেন বিশ্বব্যাপী প্রতীক। তেমনই এক নাম চে গেভারা। তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসক, বিপ্লবী, লেখক, গে*রিলা নেতা, কূটনীতিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ।
১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্নার জন্ম। পরবর্তীকালে তিনি ‘চে’ নামেই পরিচিতি লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন প্রচণ্ড কৌতূহলী ও বইপাগল।
শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগলেও খেলাধুলা, ভ্রমণ এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি তার আগ্রহ ছিল অসাধারণ। পরিবারের সমাজসচেতন পরিবেশ তার চিন্তার জগৎকে প্রভাবিত করেছিল। কৈশোরেই তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও শোষণের বাস্তবতা।
চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ার সময় তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—মোটরসাইকেলে লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ। এই ভ্রমণে তিনি প্রত্যক্ষ করেন খনি শ্রমিকদের দুর্দশা, কৃষকদের দারিদ্র্য এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা। পেরুর কুষ্ঠরোগীদের কলোনিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, লাতিন আমেরিকার মানুষের দুর্ভোগের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক শোষণ, সা*ম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক বৈষম্য। এই উপলব্ধিই তাকে চিকিৎসকের জীবন থেকে বিপ্লবের পথে নিয়ে যায়।
১৯৫০-এর দশকে গুয়াতেমালার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ চে গেভারার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। পরে মেক্সিকোতে তার পরিচয় হয় ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। কিউবায় একনায়ক ফুলগেনসিও বাতিস্তার বিরুদ্ধে সশ*স্ত্র সংগ্রামে যোগ দেন তিনি। পাহাড়-জঙ্গলে দীর্ঘ গে*রিলা যু*দ্ধের মাধ্যমে বিপ্লবীরা শেষ পর্যন্ত ১৯৫৯ সালে ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হন।
কিউবান বিপ্লবের সাফল্যের পর চে গেভারা নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কিউবার জাতীয় ব্যাংকের প্রধান এবং পরে শিল্পমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং সামাজিক সংস্কারে তিনি ভূমিকা রাখেন। তবে তিনি কখনোই কেবল রাষ্ট্রীয় পদে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি। তার বিশ্বাস ছিল, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। সেই চিন্তা থেকেই তিনি আফ্রিকার কঙ্গো এবং পরে বলিভিয়ায় বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করেন।
চে গেভারার জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয় বলিভিয়ায়। ১৯৬৭ সালে সেখানে গে*রিলা যু*দ্ধ পরিচালনার সময় তিনি সেনাবাহিনীর হাতে ব*ন্দী হন। ৯ অক্টোবর তাকে হ*ত্যা করা হয়। মৃ*ত্যুর মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শেষ হলেও জন্ম হয় নতুন কিংবদন্তির। পরবর্তীকালে তার ছবি, বক্তব্য ও লেখালেখি বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ, স্বাধীনতা ও বি*দ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠে।
চে গেভারা শুধু বিপ্লবীই ছিলেন না, ছিলেন একজন শক্তিশালী লেখকও। তার ‘মোটরসাইকেল ডায়েরিজ’ তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশকে তুলে ধরেছে। এছাড়া গে*রিলা যু*দ্ধ, সমাজতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে তার লেখা বহু বই ও প্রবন্ধ এখনো পাঠকদের আকৃষ্ট করে।
মৃ*ত্যুর প্রায় ছয় দশক পরও চে গেভারা বিশ্বজুড়ে তরুণদের কল্পনা ও রাজনৈতিক চেতনায় উপস্থিত। তার মুখাবয়ব খচিত পোস্টার, টি-শার্ট কিংবা দেয়ালচিত্র কেবল একজন মানুষের ছবি নয়; বরং তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্র*তিরোধ, পরিবর্তনের স্বপ্ন এবং আদর্শের জন্য আত্মত্যাগের এক শক্তিশালী প্রতীক।
