
চীন বর্তমানে একই সাথে দুটি যুদ্ধকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রথমটি হলো ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাত ‘অপারেশন সিন্দুর’, যেখান থেকে তারা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং পাকিস্তানের ব্যবহৃত চীনা যুদ্ধাস্ত্রের কার্যকারিতা বোঝার চেষ্টা করছে।
দ্বিতীয়টি হলো ইরান যুদ্ধ, যেখান থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক কৌশল, এআই-চালিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সব কিছুর মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে সম্ভাব্য তাইওয়ান সংকটের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা।
অপারেশন সিন্দুর ও চীনা সংশ্লিষ্টতা

২০২৫ সালের জুন মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত অপারেশন সিন্দুরের সময় ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে, তা চীন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট সম্প্রতি নিশ্চিত করেছে, চীন শুধু পর্যবেক্ষণই করেনি, বরং পাকিস্তানকে সরাসরি কারিগরি সহায়তাও দিয়েছে। পাকিস্তানের কেনা চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমানগুলো যাতে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা নিয়ে লড়তে পারে, তা নিশ্চিত করতে চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রকৌশলীরা সরাসরি মাঠে কাজ করেছেন। এর ফলে পাকিস্তান বাহিনীর ব্যবহৃত রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার যুদ্ধকালীন তথ্য পাওয়ার বিরল সুযোগ পেয়েছে বেইজিং।
ইরান যুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির মহড়া

ইরান যুদ্ধকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও দুর্বলতা পরখ করার একটি ‘লাইভ ল্যাবরেটরি’ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যখন একসাথে অসংখ্য হামলার সম্মুখীন হয়, তখন সেগুলো কতটা কার্যকর থাকে, তা চীন খতিয়ে দেখছে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে উচ্চ প্রযুক্তির গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কতটা থাকে, সেটিও বেইজিংয়ের গবেষণার বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা সিএনএন’কে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘কিল চেইন’ বা লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত থেকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (যেমন- ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম) ব্যবহার করা হচ্ছে, তার গতি ও কার্যকারিতা দেখে চীন তাদের নিজস্ব এআই প্রোটোকল উন্নত করার চেষ্টা করছে। সামরিক কৌশলের পাশাপাশি হোয়াইট হাউস কীভাবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন সামাল দিচ্ছে, তাও বেইজিংয়ের নজর এড়াচ্ছে না।
আকাশ প্রতিরক্ষা ও আধুনিক যুদ্ধকৌশল

আক্রমণাত্মক দিক থেকে চীন এখন বেশ শক্তিশালী। তাদের হাতে রয়েছে জে-২০ এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল, যা যে কোনো রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। সিপ্রি’র তথ্য অনুযায়ী, চীন প্রতি বছর তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডারে প্রায় ১০০টি নতুন ওয়ারহেড যুক্ত করছে। এছাড়া সংখ্যার বিচারে চীনের নৌবাহিনী এখন বিশ্বের বৃহত্তম।
তবে চীনের সাবেক বিমানবাহিনী কর্নেল ফু কিয়ানশাও সিএনএন’কে বলেন, চীনকে এখন তাদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোনের মতো সস্তা অথচ গণহারে তৈরি মারণাস্ত্র যেভাবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করেছে, তা থেকে বেইজিং নতুন যুদ্ধকৌশল শিখছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তাদের ‘লুকাস’ ড্রোনের মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিচ্ছে, সেটিও চীনের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাইওয়ান কি চূড়ান্ত লক্ষ্য?
আধুনিক যুদ্ধের প্রথম বাধাই হলো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। চীন বর্তমানে বিশ্বের দুটি শক্তিশালী ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে, ইরানে ব্যবহৃত মার্কিন ‘প্যাট্রিয়ট’ এবং ভারতে থাকা রাশিয়ার ‘এস-৪০০’। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাইওয়ান দখলের জন্য বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা কখনোই নাকচ করেননি। তাই তাইওয়ান প্রণালীতে সম্ভাব্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যখন তাদের উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে হস্তক্ষেপ করবে, তখন কীভাবে স্বল্প ব্যয়ে এবং দ্রুততম সময়ে জয় নিশ্চিত করা যায়, বেইজিং এখন সেই ছকই কষছে।

পররাষ্ট্র সচিব মার্ক রুবিওর সাম্প্রতিক মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা অনিশ্চিত হলেও তারা তাইওয়ান অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। চীন জানে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তাদের তেলের ৩৩-৩৭ শতাংশ পরিবাহিত হয়, তাই ইরানের স্থিতিশীলতা যেমন জরুরি, তেমনি তাইওয়ান ইস্যুতে একটি চূড়ান্ত ও দ্রুত জয় অর্জন করাও তাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বেইজিংয়ের এই দ্বিমুখী পর্যবেক্ষণ মূলত সেই চূড়ান্ত সংঘাতের প্রস্তুতি মাত্র।
লেখক: এনডিটিভি’র সিনিয়র এডিটর। প্রিন্ট ও ডিজিটাল মিডিয়ায় ১৫ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই সাংবাদিকের সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে ডিগ্রি রয়েছে। তিনি রাজনীতি, ব্যবসা, খেলাধুলা এবং বিনোদন জগতের সংবাদ নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু ফুটবল দেখতেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পান।
আরবিএস
