
আজকের দিনে প্রায় প্রতিটি ঘরেই মা-বাবার সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্তানের অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি যেখানে খাবার খাওয়ানো, শান্ত রাখা কিংবা নিজের একটু কাজের অবসরের জন্য যে ফোনটি শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সেটিই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা হয়ে উঠেছে এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে শিশুর হাত থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নিলেই শুরু হয় বুকফাটা কান্না, চিৎকার, মাটিতে গড়াগড়ি কিংবা জিনিসপত্র ভাঙচুরের মতো তীব্র জেদ।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে শিশুর এই কান্না বা আচরণ কোনো সাধারণ জেদ নয় বরং এটি মাদকাসক্তদের মতো এক ধরনের মানসিক নির্ভরশীলতা বা ডিজিটাল উইথড্রয়াল সিন্ড্রোম যা থেকে মুক্ত করতে প্রথম শর্ত হলো শিশু কান্না শুরু করলে কোনোভাবেই লোকলজ্জার ভয়ে আবার ফোনটি তার হাতে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না কারণ এতে শিশু শিখে ফেলে যে কান্নাকাটি করলেই ফোন পাওয়া যায়। শিশুর হাত থেকে যখন একটি আকর্ষণীয় জিনিস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তখন তার চেয়েও আকর্ষণীয় কিছু যেমন রঙিন ও পপ-আপ গল্পের বই, উজ্জ্বল রঙের ছবি আঁকার খাতা, লেগো ব্লক, কিংবা মাটির খেলনা তৈরি করার সামগ্রী তার সামনে তুলে ধরতে হবে যা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি তাকে দীর্ঘক্ষণ ব্যস্ত রাখবে। অধিকাংশ শিশু মোবাইলের দিকে ঝুঁকে পড়ে যখন সে একা বোধ করে বা মা-বাবার মনোযোগ পায় না তাই প্রতিদিন ঘরের কাজের বাইরে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় সম্পূর্ণভাবে শিশুর জন্য বরাদ্দ রেখে তার সাথে মাটিতে বসে লুডু, ক্যারাম বা কানামাছি খেলা এবং গল্প করার মাধ্যমে তার একাকীত্ব দূর করতে হবে।
ঘরের কিছু জায়গা যেমন ডাইনিং টেবিল এবং শোবার ঘরকে সম্পূর্ণ মোবাইল মুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর ঠিক এক ঘণ্টা আগে বাড়ির কেউ মোবাইল স্পর্শ করবে না এমন পারিবারিক নিয়ম তৈরি করতে হবে কারণ শিশুরা মুখে বলার চেয়ে চোখের সামনে মা-বাবাকে যা করতে দেখে তা দ্রুত অনুকরণ করে। হুট করে শিশুর হাত থেকে ফোন কেড়ে না নিয়ে তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে কাউন্টডাউন পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে যেখানে ফোন দেওয়ার সময়ই সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং সময় শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে মনে করিয়ে দিলে সে নিজে থেকেই ফোনটি ফিরিয়ে দিতে শিখবে।Family
শিশুর এই মোবাইল আসক্তি একদিনে তৈরি হয়নি তাই এটি দূর হতেও কিছুটা সময় এবং মা-বাবার পাহাড়সম ধৈর্যের প্রয়োজন হবে যেখানে শিশুকে বকাঝকা বা মারধর না করে পরম মমতায় প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া, বিকেলে ছাদে বা পার্কে অন্য বাচ্চাদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করতে দেওয়া এবং তার শৈশবকে আনন্দময় করে তোলাই হবে স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে মুক্তির একমাত্র প্রধান চাবিকাঠি।
