
দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বেকারত্বের কারণে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাদক মামলার দ্রুত বিচার করে শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে। এ ধরনের মামলার দ্রুত বিচার করতে হবে। অন্যথায় এই অপরাধের লাগাম টানা যাবে না
সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
ঢাকার চলচ্চিত্রপাড়ার আলোচিত নায়িকা পরীমণি। ২০২১ সালের ৪ আগস্ট রাতে বনানীর বাসা থেকে পরীমণি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র্যাব। এ সময় বাসায় বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া যায়। পরদিন ৫ আগস্ট র্যাব-১ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরীমণি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে। এ মামলায় ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে পরীমণি হাইকোর্টে অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। হাইকোর্ট চূড়ান্ত শুনানি করে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি নতুন করে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করতে বলেন। তবে ওই আদেশের পর দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও বিচারিক আদালতে আজও শুনানি শুরু হয়নি। কবে শুনানি শুরু হবে তাও নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি পরীমণির আইনজীবী। অর্থাৎ মামলার পর পাঁচ বছর অতিবাহিত হতে চললেও আজও মামলাটিতে অভিযোগ গঠনই সম্ভব হয়নি। বিচার শুরু ও শেষ হতে কত বছর লাগবে সেই প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের পর বছর মাদক মামলার বিচার আটকে থাকছে আদালতে। কিছু কিছু মামলায় যুগ পার হচ্ছে; তবুও বিচার শেষ হচ্ছে না। দীর্ঘদিন বিচার না হওয়ায় মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। খোঁজ পাওয়া যায় না সাক্ষীদের। আবার তদন্তে গাফিলতি ও দুর্বলতায় পার পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। পাশাপাশি মাদকের রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতাও বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে একদিকে দিন দিন মামলার স্তূপ জমছে; অন্যদিকে সাজার হারও কমে যাচ্ছে। বিচার প্রক্রিয়ায় নানা দুর্বলতা ও ত্রুটির সুযোগে আসামিদের বড় অংশ খালাস পেয়ে যাচ্ছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন।
জানা যায়, বর্তমানে সারা দেশের আদালতগুলোতে শুধু ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে প্রায় ২৮ লাখ। এর মধ্যে মাদক মামলার সংখ্যাই প্রায় পাঁচ লাখ। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মাদক মামলা প্রায় এক লাখ। আর উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে প্রায় আড়াইশ মামলার। ২০১৮ সালে সারা দেশে মাদক মামলা বিচারাধীন ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৪টি। আট বছরে সেই মামলা বেড়ে তিন গুণেরও বেশি হয়েছে। মামলার পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, দেশে মাদক সেবনকারী ও মাদকের ব্যবহার আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনার সঙ্গে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মাদক সেবনের পর চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে জড়ানোর মানসিকতা তৈরি হয়। মাদকের বিস্তারের ফলে তরুণদের একাংশের জীবন নষ্ট হয়। পরিবারে অশান্তি বাড়ে। তারা নানা রোগে আক্রান্ত হন। মাদকাসক্তি ও রোগের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। মাদক চোরাচালানে দেশ থেকে বিপুল অর্থ পাচার হয়। মাদকের ভয়াল থাবা সমাজকে কলুষিত করছে এবং দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সর্বশেষ আলোচিত পল্লবীর শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি সোহেল মাদক ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল বলে তথ্য সামনে এসেছে। এর আগে ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় ধর্ষণের শিকার হন। ওই ঘটনায় জড়িত মজনু ছিল পুরোপুরি মাদকাসক্ত। সে ইয়াবা ও হেরোইনের মতো মাদকে আসক্ত থাকার প্রমাণ পায় র্যাব। প্রায় একই সময় সিলেটে এমসি কলেজে স্বামীর সামনে থেকে স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় হয়। এ ঘটনায় আটজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে। ওই ঘটনায়ও পুলিশ জানিয়েছিল, ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত গ্রেপ্তাররা নিয়মিত মাদক সেবন করত।
স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, মাদক সেবনের এমন জঘন্য প্রবণতা ও প্রভাব পর্যালোচনা করে এবং বিচারে দীর্ঘসূত্রতা লক্ষ্য করে এবার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। মাদক মামলার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে ফের স্বতন্ত্র ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বতন্ত্র ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের বিধান করার পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধির অধীনে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে বিচারের সুযোগও রাখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের আগামী বাজেট অধিবেশনে এ সংশোধনী পাস হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা যায়, ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে ২০১৮ সালে তা যুগোপযোগী করা হয়। সংশোধিত আইনে মাদক মামলার বিচারের জন্য প্রতি জেলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের স্থাপনের বিধান রাখা হয়। তবে ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার সংশ্লিষ্ট জেলার যে কোনো অতিরিক্ত জেলা জজ বা দায়রা জজকে তার নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব দিতে পারবে বলে বিধান করা হয়।’ বিচারক ও এজলাস সংকটের কারণ দেখিয়ে পরে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। ট্রাইব্যুনাল গঠন না করায় সে সময় মাদক মামলার বিচার নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। পরে ২০২০ সালের নভেম্বরে আইনটিতে ফের সংশোধনী আনা হয়। জেলা দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতসহ (ক্ষেত্রবিশেষে মহানগর দায়রা আদালত ও মহানগর অতিরিক্ত দায়রা আদালত) মাদকের পরিমাণ সাপেক্ষে এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও বিচারের বিধান করা হয়। এ আইন অনুযায়ী পাঁচ বছরের (ক্ষেত্রবিশেষে ৭ বছর) নিচে সাজা দিতে পারেন মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। দায়রা আদালত ও অতিরিক্ত দায়রা আদালত মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন সাজা দিতে পারেন। অভিযোগপত্র গঠনের সময় থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। অনিবার্য কারণে এ মেয়াদে সমাপ্ত না হলে অতিরিক্ত ৩০ কার্যদিবসে বিচার শেষ করতে হবে; সে ক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করতে হবে। এ সময়েও না হলে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে আবশ্যিকভাবে বিচার শেষ করতে হবে। এ মেয়াদ আর কোনোভাবেই বাড়ানো যাবে না। কিন্তু আইনের এ বিধানের প্রতিপালন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে বছরের পর বছর এমনকি যুগ পার হয়ে যাচ্ছে বিচার শেষ হতে।
এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশের আদালতগুলোয় বহু মাদক মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থায় বড় জট তৈরি করছে। এসব মাদক মামলার দ্রুত ও কার্যকর নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। এর পাশাপাশি মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনকেও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও কঠোর করতে এতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।’ এর আগে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার যে কোনো ধরনের অনিয়ম, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখবে।
বিচারে দীর্ঘসূত্রতা; খালাসে গতি: দেশের অধস্তন আদালতগুলোয় মামলা জট অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সারা দেশে প্রায় ৪৭ লাখ মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ফৌজদারি মামলা রয়েছে প্রায় ২৮ লাখ। এই ২৮ লাখের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রয়েছে মাদক মামলা। মাদক মামলার বিচারের দায়িত্বে থাকা আদালতগুলোয় আরও নানা ধরনের মামলার বিচার হয়। বিশেষ আদালত ও দায়রা আদালত নামে হত্যা, অস্ত্র, দুর্নীতি, অপহরণ ও মাদকের মতো স্পর্শকাতর মামলার বিচারকাজ করেন একজন বিচারক। আবার কোনো কোনো আদালত চলে এজলাস ভাগাভাগি করে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটা ছেড়ে আরেকটা মামলার শুনানি করতে গিয়ে লম্বা সময়ের তারিখ পড়ে। দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচার জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে। এ কারণে লঘু-গুরু যে কোনো ফৌজদারি মামলা পাঁচ বছরের আগে নিষ্পত্তি হতে দেখা যায় না। আর দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ে মামলার বিচারও সঠিকভাবে হচ্ছে না। পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে বেশিরভাগ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাদকের মামলায় আসামি খালাসের হার ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। মাদকসহ হাতেনাতে ধরা পড়লেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসামিরা বিচারিক প্রক্রিয়ায় খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আইনজীবীরা বলছেন, এ পরিস্থিতি কাটাতে হলে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য বিচার বিভাগকে ঢেলে সাজাতে হবে। আরও বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ করতে হবে। এজলাসসহ অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়াতে হবে।
এ ব্যাপারে সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহজাহান সাজু কালবেলাকে বলেন, বিচার বিভাগ নানামুখী সংকটে রয়েছে। এ সংকট কাটাতে সরকারের বিশেষ নজর প্রয়োজন। বিশেষ করে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে। বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ, জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদানের জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বেকারত্বের কারণে মাদকসেবীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মাদক মামলার দ্রুত বিচার করে শাস্তি দৃশ্যমান করতে হবে। এ ধরনের মামলার দ্রুত বিচার করতে হবে। অন্যথায় এ অপরাধের লাগাম টানা যাবে না। তিনি মাদক মামলার বিচারে স্বতন্ত্র ট্রাইব্যুনাল গঠনে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানান।
‘মানা হয়নি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ’: দেশের অধস্তন আদালতগুলো থেকে যেসব মাদক মামলায় অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে, সেগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত বলেন, মাদক মামলায় দেখা যাচ্ছে, অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর সাক্ষী না আসায় বিচারপর্যায়ে গিয়েও সাক্ষ্য গ্রহণ হচ্ছে না। মাদক মামলা নিষ্পত্তিতে নিম্ন আদালতের সক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। তদন্ত কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে সাক্ষী আনলে, বিচারক ও সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আন্তরিক থাকলে আমলে নেওয়ার পর এক দিনের মধ্যেই মামলার নিষ্পত্তি হওয়া সম্ভব। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা এক মামলায় এক আসামির জামিন আবেদনের শুনানিতে আদালত ওই আদেশ দেন।
হাইকোর্ট মামলার ধার্য তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে তৎপর থাকতে নির্দেশ দেন। সাক্ষী উপস্থাপনে শিথিলতা দেখালে বা ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারকে (এসপি) অবহিত করতে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতকে বলা হয়েছে। পাশাপাশি মাদক মামলায় সাক্ষীর উপস্থিতি তদারকি করতে সংশ্লিষ্ট ডিসি ও এসপিকেও নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের এই আদেশের কপি আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; যাতে সংশ্লিষ্ট ডিসি, এসপি, বিচারকসহ সংশ্লিষ্টরা অবহিত হতে পারেন। অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর ছয় মাসের মধ্যে মাদক মামলার নিষ্পত্তি না হলে কেন হয়নি, তা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট বিচারককে নিম্ন আদালত তদারকিতে থাকা সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মামলা পরিচালনায় পিপির গাফিলতি দেখা গেলে মাদক মামলার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে বলা হয়। হাইকোর্টের ওই আদেশটি বহাল রয়েছে। কিন্তু মানা হয়নি।
যেসব জেলায় হতে পারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের রুট গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল, গোল্ডেন ওয়েজ, গোল্ডেন ভিলেজ ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের প্রভাবে বাংলাদেশ রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। কারণ ভারত ও মিয়ানমার থেকে ভয়ংকর সব মাদকের অনুপ্রবেশ ঘটছে বাংলাদেশে। জল, স্থল ও আকাশ পথে স্রোতের মতো মাদক আসছে। আবার নিত্যনতুন মাদকের প্রতি মাদকসেবী তরুণদেরও ঝোঁক বেশি থাকে। ফলে শহর-নগর, পাড়া-মহল্লা সবখানেই তৈরি হয়েছে মাদক ব্যবসায়ীদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। ফেনসিডিল, ইয়াবা, কোকেন কিংবা ক্রিস্টাল মেথ-আইস, কুশ, খাট, ডিওবিসহ সব ধরনের মাদকই মিলছে দেশজুড়ে। চাইলে মিলছে হোম ডেলিভারিও। সারা দেশে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মাদক। এ কারণে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যাও। মাদকবিষয়ক প্রতিবেদনে দেশের চারটি অঞ্চলের ১০৪টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের ৮ জেলার ৪৩টি, পূর্বাঞ্চলের ৪ জেলার ২১টি, উত্তরাঞ্চলের ৫ জেলার ২১টি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা কক্সবাজারের ১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে প্রাক্কলিত মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৩ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
অন্যদিকে মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণেও দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা ছাড়া অন্য যেসব আদালতে মাদক মামলা বেশি বিচারাধীন, তার সবগুলোর অবস্থান সীমান্তবর্তী এলাকা ঘেঁষে। ঢাকার আদালতে সবচেয়ে বেশি ৮১ হাজার ১৩৯টি মাদক মামলা বিচারাধীন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম আদালতে ৩৯ হাজার ৬৫৭টি মামলা। তৃতীয় অবস্থানে রাজশাহী আদালতে ২৬ হাজার ৩৪৯টি। এরপর কক্সবাজার, নওগাঁ, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, যশোর, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও খুলনার আদালতে মাদক মামলা রয়েছে অন্য এলাকার চেয়ে অনেক বেশি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সীমান্তবর্তী যেসব এলাকায় মাদক মামলা বেশি বিচারাধীন সেই সব এলাকায় প্রথমে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের চিন্তা করছে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অন্য জেলাগুলোতেও এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হবে।
