
বরগুনার আমতলী উপজেলায় নির্মাণাধীন পৌর লেকের একটি আরসিসি প্ল্যাটফর্ম ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। স্টিলের পরিবর্তে বাঁশের সাটারিং ও কাঠের ব্যবহার করায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন কাজের প্ল্যাটফর্ম ধসে পড়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ছাড়াও ল্যাব পরীক্ষায় অনুমোদিত রডের পরিবর্তে নিম্নমানের রড ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
অপরদিকে ঘটনার পরপরই নির্মাণাধীন অবস্থায় ধসে পড়া প্লাটফর্মের ওই অংশ পরিদর্শন করে প্রাথমিকভাবে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন ও নির্মাণ সামগ্রীর পরীক্ষার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণেরও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আমতলী উপজেলায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এলজিসিআরআরপি প্রকল্পের আওতায় পৌর লেকের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য একটি ওয়াকওয়ে ও আরসিসি ডেক প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটির বাজেট ধরা হয় ১২ কোটি ৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৩২৩ টাকা। ২০২৪ সালের ২৫ অক্টোবর যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আশরাফুল আলম। তবে ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই কাজ শুরু করে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা শেষ করতে পারেনি ঝালকাঠির ইসলাম ব্রাদার্স নামে কাজ শুরু করা একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এরপর বর্ধিত সময়ে নির্মাণ কাজ চলাকালে চলতি বছরের ৩০ আগস্ট সৌন্দর্যবর্ধন ওয়াকওয়ের নির্মাণাধীন একটি আরসিসি প্ল্যাটফর্মে ঢালাই চলাকালে তা ধসে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণ কাজ শুরুর পর থেকেই অনিয়ম শুরু হয় ওই প্রকল্পের কাজে। আরসিসি প্ল্যাটফর্মে ঢালাইয়ের জন্য স্টিলের সাটারিং ব্যবহার করার কথা থাকলেও বাঁশের সাটারিং ও কাঠের ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান তারা। আর এ কারণেই নির্মাণাধীন আরসিসি প্লার্টফর্মটি ধসে পড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
আমতলী স্থানীয় বাসিন্দা এইচ এম রাসেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১২ কোটি টাকার এই প্রকল্পের শুরু থেকেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ থাকলেও এর কোনো প্রতিকার হয়নি। কয়েকদিন আগে ঢালাই চলাকালীন একটি প্লাটফর্ম ধসে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে থাকায় ব্যবহৃত রডেও মরিচা পড়েছে।
মোমেন নামে স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই প্রকল্পের অনিয়মের কোনো শেষ নেই। দীর্ঘদিন প্রকল্পের কাজ ফেলে রাখা হয়েছে। এখন কাজ চলছে কিন্তু ব্যবহৃত রডগুলো মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। দেখভালের দায়িত্বে থাকা পৌরসভার সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। এখন উপর থেকে ঢালাই দিচ্ছে আর নিচ দিয়ে তা পড়ে যাচ্ছে। এ প্রকল্পের কাজে যে অনিয়ম হয়েছে, তা তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।
এ ছাড়াও ওই প্রকল্পের কাজে অনিয়ম হচ্ছে জানতে পেরে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে হেনস্তার শিকার হন আমতলী উপজেলায় কর্মরত কালবেলার প্রতিনিধি মনির হোসেন। তিনি এ অভিযোগ জানিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, পৌর লেকের সৌন্দর্যবর্ধনে সাড়ে ১২ কোটি টাকার যে কাজটি হচ্ছে তাতে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার খবর পাই। এমনকি ল্যাব পরীক্ষায় অনুমোদিত রডেরও ব্যবহার করা হচ্ছে না এবং স্টিলের পরিবর্তে কাঠের সাটারিং ব্যবহার করা হচ্ছে। এমন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাকে অবরুদ্ধ করে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন।
বরগুনার সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি ও জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন কামাল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমতলীতে যে ঘটনা ঘটেছে এতে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উভয়েরই গাফিলতি রয়েছে বলেই আমরা মনে করি। নিম্নমানের যে কাজ হচ্ছিল তাতে উভয় পক্ষই সমান অপরাধী। ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার দুজনের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই তদন্ত করে এই কাজে আরও যদি কেউ জড়িত থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
লেকের সৌন্দর্যবর্ধন ওয়াকওয়ের নির্মাণাধীন আরসিসি প্লাটফর্ম ধসে পড়ার বিষয়ে ঠিকাদার কর্তৃপক্ষের মধ্যে শেখ নোমান রেজা ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটা পানির ভিতরের কাজ। এ কাজের বিষয়ে আমাদের কোনো গাফিলতি নেই। যা হয়েছে তা সাটারিং এর একটি কাঠ খুলে যেতে পারে বা একটি বাঁশ বেঁকে যেতে পারে।
নির্মাণাধীন আরসিসি প্লাটফর্ম ধসে পড়ার খবর পেয়ে সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, নির্মাণ কাজে ঢালাইয়ের জন্য যে সব সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে তার কোয়ালিটি দেখতে হবে। ল্যাব পরীক্ষার জন্য নমুনা সিলগালা করে পাথর বালু এবং অন্য সামগ্রী নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় পাঠিয়ে বুয়েটে পরীক্ষার পরে এসব সামগ্রীর গুণগত মান বোঝা যাবে। তবে খালি চোখে দেখে মনে হচ্ছে লেকটির সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য সরকার যে টাকা খরচ করছে, সে অনুযায়ী এখানে আপাতদৃষ্টিতে ঠিকাদার কাজ করেননি। কারণ এখানে বলা ছিল স্টিল সাটারিং কিন্তু তা না করে বাঁশের সাটারিং ও কাঠ ব্যবহার করেছেন, যা দৃশ্যমান। পাশাপাশি যেহেতু লেক, সেখানে কাজ করতে গেলে কি পরিমাণ লোড নিতে পারবে তাও হয়ত পরীক্ষা করা হয়নি। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এবং ল্যাব পরীক্ষার পরে সম্পূর্ণ তথ্য পেয়ে পরবর্তী মতামত ব্যক্ত করা যাবে বলে জানান তিনি।
মো. আব্দুল আলীম /এসএইচএ
