
ছবি : এআই
বহুদিন পর আজ আবার আমাদের দেহের রোমাঞ্চকর গল্প। আজকের বিষয় আমাদের ডিএনএর ভেতরেও আদিম পৃথিবীর স্মৃতির রোমাঞ্চকর গল্প। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা ডিএনএকে শুধুই একটি জৈবিক কোড হিসেবে জানি যা আমাদের চোখের রং, উচ্চতা, চুলের প্রকৃতির মতো বিষয়গুলোই নির্ধারণ করে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? বিজ্ঞান বলছে, ডিএনএ আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি এক জীবন্ত ইতিহাসের বই যা পৃথিবীতে জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি অধ্যায় ধারণ করে আছে। আর সেই বইটির প্রতিটি অক্ষর লেখা আছে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষেও।
আমাদের শরীরের ডিএনএ শুধু আমাদের ব্যক্তিত্ব বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য বহন করে না। এটি ধারণ করে আছে পৃথিবীর প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর পুরোনো ইতিহাস। সেই সময় পৃথিবীতে ছিল না কোনো মানুষ, ছিল না কোনো গাছ, ছিল না কোনো প্রাণী। ছিল শুধু একটি উত্তপ্ত, অদ্ভুত, বিশৃঙ্খল গ্রহ। সেই গ্রহেই প্রথম জন্ম নেয় অত্যন্ত ক্ষুদ্র এককোষী প্রাণ। আর সেই প্রাণগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যতের সমস্ত জীবনের বীজ। যাকে বিজ্ঞান বলছে
জেনেটিক তথ্য।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই তথ্য কপি হতে থাকে। আর এই কপি করার সময় ছোট ছোট ভুল হতো যাকে আমরা বলি মিউটেশন। বেশিরভাগ মিউটেশন হারিয়ে গেলেও কিছু কিছু থেকে গেছে, জমা হয়েছে, এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তৈরি করেছে নতুন বৈশিষ্ট্য, নতুন প্রজাতি, নতুন জীবন। নতুন গঠন, নতুন অস্তিত্ব।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে মানুষের এই ডিএনএর প্রায় ৯৮-৯৯ শতাংশ মিলে যায় শিম্পাঞ্জির সঙ্গে (গবেষণা তাই নিশ্চিত করে)। কিন্তু শুধু তাই নয়, মানুষের ডিএনএর কিছু অংশ কলা গাছের সঙ্গেও মিলে যায়, হা হা! হ্যাঁ, একজন মানুষ আর একটি কলাগাছের মধ্যে কিছু জিন মিলে যায়। এর কারণ, পৃথিবীর সমস্ত জীবন একটি বিশাল পারিবারিক বৃক্ষের শাখা। মানে হলো সবাই একই আদিম জীবন থেকে এসেছি।
বিজ্ঞানীরা মানুষের ডিএনএর ভেতরে কিছু অংশ খুঁজে পেয়েছেন যা আজ কোনো কাজেই আসে না। এগুলোকে তারা বলেন জেনেটিক ফসিল। যেমন মাটির নিচে ডাইনোসরের হাড় পাওয়া যায়, তেমনি আমাদের ডিএনএর ভিতরেও লুকিয়ে আছে এক সময়ের দরকারি কিন্তু এখন অকেজো বৈশিষ্ট্যের চিহ্ন। যেন কোটি বছরের পুরোনো নীরব সাক্ষী যা বলে দেয় আমাদের পূর্বপুরুষরা কোন পরিবেশের মধ্য দিয়ে এসেছেন।
আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে আছে প্রায় দুই মিটার লম্বা ডিএনএ। আর তোমার শরীরে রয়েছে প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ। মানে হলো, আমাদের ভেতরে সংরক্ষিত তথ্যের পরিমাণ কল্পনাতীত। এটা একটি লাইব্রেরি নয়, যেন এক জীবন্ত টাইম মেশিন।
ডিএনএ এখনো পরিবর্তিত হচ্ছে। এই মুহূর্তেও, প্রতিটি নতুন প্রজন্মের সাথে যোগ হচ্ছে নতুন মিউটেশন, তৈরি হচ্ছে নতুন বৈশিষ্ট্য। তার মানে ঐ বিবর্তনের গল্প শেষ হয়নি এখনো লেখা হচ্ছে। আর সেই চলমান ইতিহাসের অংশ আপনি আমি নিজেও।
