
হারুকি মুরাকামি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের একজন । তার লেখার ভেতরে সবসময়ই একটা অদ্ভুত রহস্য, গভীরতা আর রূপক অর্থ লুকিয়ে থাকে। আজ কথা বলবো তার অসাধারণ একটি বই ‘অদ্ভুত লাইব্রেরি’ নিয়ে।
মুরাকামির প্রায় প্রতিটি সাহিত্যকর্মের মতো এই বইটিও পাঠককে শুধু গল্প শোনায় না, বরং চিন্তার ভেতর ডুবিয়ে দেয়। বইটা যারা পড়ে শেষ করবেন, তারা একসময় ঠিকই বলবেন ‘ অদ্ভুত লাইব্রেরি’ সত্যিই এক অদ্ভুত জগৎ।
গল্পের শুরু হয় এক কিশোরকে দিয়ে। স্কুল থেকে ফেরার পথে সে প্রতিদিনের মতো তাদের এলাকার লাইব্রেরিতে যায় বই ফেরত দিতে এবং নতুন বই নিতে। কাউন্টারে বসা এক মহিলা তাকে জানায়, যে বই সে খুঁজছে সেটা পেতে হলে নিচতলার ১০৭ নম্বর কক্ষে যেতে হবে। অথচ সে জানতোই না এই লাইব্রেরির কোনো নিচতলা আছে। ভয় আর কৌতূহল নিয়ে সে ধীরে ধীরে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে। চারপাশের পরিবেশ এতটাই গা ছমছমে ছিল যে কয়েকবার তার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু আবার ভাবে, এতদূর যখন এসেছি, দেখি সামনে কী আছে।
নিচে গিয়ে সে এক অদ্ভুত বৃদ্ধ লোকের দেখা পায়। বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করে কী বই লাগবে। ভয় পেয়ে ছেলেটি হঠাৎ বলেই ফেলে যে সে জানতে চায় অটোমান সাম্রাজ্যে কর আদায় কেমন ছিল। বৃদ্ধ তার পছন্দের প্রশংসা করে তিনটি বই এনে দেয়। কিন্তু ছেলেটি যখন বই নিয়ে বাসায় ফেরার জন্য বের হতে যায়, তখনই বৃদ্ধ তাকে থামিয়ে দেয়। জানায়, এই বইগুলো বাইরে নেওয়া যাবে না, এখানেই বসে পড়তে হবে। ছেলেটি তখন প্রায় কেঁদে ফেলে। সে বলে, সন্ধ্যা হয়ে যাবে, মা চিন্তা করবে। কিন্তু বৃদ্ধের মনে কোনো দয়া ছিল না।
এরপর বৃদ্ধ ছেলেটিকে লাইব্রেরির আরো গভীরে, গোলকধাঁধার মতো এক অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে বন্দি করে রাখে। সেখানে তার পরিচয় হয় এক মেষ মানবের সঙ্গে। মেষ মানবকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ছেলেটিকে পাহারা দেওয়ার জন্য। ছেলেটিকে জানানো হয়, এক মাসের মধ্যে তাকে বই তিনটি শেষ করতে হবে, তার আগে সে কোথাও যেতে পারবে না। ছেলেটি যখন ভাবে বই শেষ হলে অন্তত মুক্তি পাবে, তখন মেষ মানব তাকে ভয়ংকর এক কথা বলে বই শেষ হওয়ার পর বৃদ্ধ তার মাথা ফাটিয়ে মগজ খেয়ে ফেলবে। কারণ, জ্ঞানে ভরা মগজের স্বাদ নাকি অমৃতের মতো।
এই কথা শুনে ছেলেটি ভয়ে জমে যায়। সে মায়ের কথা ভাবে, তার পোষা পাখির কথা ভাবে। কিন্তু কেউই যেন তার কথা শুনতে চায় না। এমন সময় এক রহস্যময় মেয়ের আগমন ঘটে। মেয়েটি কথা বলতে পারে না, কিন্তু তার হাসি আর ব্যবহারেই ছেলেটির মন ভালো হয়ে যায়। সে সুস্বাদু খাবার এনে দেয়, গল্প শোনে, ছেলেটির দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মেষ মানব বলে এখানে কোনো মেয়ে নেই। তখন ছেলেটি বুঝতে পারে, এই জায়গাটা আসলে বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি এক অদ্ভুত জগৎ।
মেয়েটি একসময় ছেলেটিকে পালানোর সাহস দেয়। মেষ মানবকেও রাজি করানো হয়। তারা এক রাতে পালানোর চেষ্টা করে। পালানোর সময় ছেলেটিকে তার নতুন জুতো জোড়া খুলে রেখে যেতে হয়, কারণ জুতোর শব্দে বৃদ্ধের ঘুম ভেঙে যেতে পারে। জুতো জোড়াটা ছিল তার জন্মদিনে মায়ের দেওয়া উপহার। তাই মন খারাপ হলেও মেষ মানব তাকে বোঝায় “স্বাধীনতা আগে, জুতো পরে।”
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তারা গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পায় না। একসময় আবার লাইব্রেরির দরজার সামনে এসে পড়ে। ঠিক তখনই বৃদ্ধ ভয়ংকর এক কুকুর নিয়ে হাজির হয়। কুকুরটির মুখে ছিল ছেলেটির পোষা পাখি। হঠাৎ সেই পাখি বিশাল আকার ধারণ করে বৃদ্ধের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ছেলেটিকে পালাতে সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত ছেলেটি পালিয়ে বাসায় ফিরে আসে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাসার সবকিছু স্বাভাবিক। মা যেন কিছুই টের পাননি। কেউ তার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নও করে না। এরপর সে আর কখনো সেই লাইব্রেরিতে যায় না। মাঝে মাঝে ভাবতে থাকে সবকিছু কি সত্যিই ঘটেছিল, নাকি সবই ছিল তার কল্পনা?
এই বইটা আসলে শুধু একটা রহস্যময় গল্প না। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অনেক গভীর বার্তা। মুরাকামি এখানে দেখাতে চেয়েছেন, বই মানুষের চিন্তাভাবনাকে বদলে দিতে পারে। প্রতিটি মানুষের আলাদা একটা জগৎ আছে, যেখানে সবাই সবার মতো করে বেঁচে থাকে। আবার এ কথাও বুঝিয়েছেন, পৃথিবী কারো জন্য থেমে থাকে না। আমরা ভাবি আমাদের অনুপস্থিতিতে সবকিছু বদলে যাবে, অথচ বাস্তবে জীবন নিজের নিয়মেই চলতে থাকে।
বইটিতে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, নিঃসঙ্গতা, ভয়, কল্পনা আর বাস্তবতার মিশ্রণ এত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে যে ছোট্ট এই গল্পও পাঠককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। মুরাকামির লেখার সবচেয়ে বড় জাদু এখানেই তিনি খুব সাধারণ শব্দে এমন এক অনুভূতির জগৎ তৈরি করেন, যেখান থেকে বের হয়ে আসার পরও পাঠক অনেকদিন আটকে থাকে।
সব মিলিয়ে ‘অদ্ভুত লাইব্রেরি’ এমন একটা বই, যেটা পড়লে মনে হবে আপনি কোনো স্বপ্নের ভেতর হাঁটছেন। রহস্য, কল্পনা আর জীবনের গভীর দর্শনের মিশেলে বইটি সত্যিই অসাধারণ। যারা ভিন্নধর্মী বই পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটা হতে পারে দারুণ এক অভিজ্ঞতা।
