
১৭৯৭ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অ্যাডমিরাল হোরেশিও নেলসনের ডান হাত কেটে ফেলতে হয়েছিল। জীবন রক্ষাকারী সেই অস্ত্রোপচারের আগে চেতনানাশক হিসেবে তাকে দেওয়া হয়েছিল কেবল এক ঢোক রাম। মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সময় বড় ধরনের কোনো অস্ত্রোপচার করতে হতো রোগীকে পুরোপুরি জাগ্রত রেখেই। ১৮৪৬ সালে জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়ার উদ্ভাবন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বড় পরিবর্তন আনে। এর ফলে যেকোনো স্থানে সাময়িকভাবে মানুষের চেতনাহীন করার সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ৩৫ কোটিরও বেশি অস্ত্রোপচার জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়ার মাধ্যমে করা হয়। তবে এই ওষুধগুলো কীভাবে মানুষকে অবশ বা অচেতন করে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি নতুন কিছু গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের মৌলিক কার্যপ্রক্রিয়া ও চেতনার উৎপত্তি সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে।
অ্যানেস্থেশিয়ার বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রোপোফলের মতো বহুল ব্যবহৃত ওষুধগুলো মূলত মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে কোষগুলো তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে না। এমআরআই স্ক্যানে দেখা গেছে, অ্যানেস্থেশিয়ার সময় মস্তিষ্কের সার্বিক কর্মক্ষমতা অনেক কমে যায়।
তবে মানুষের চেতনা বন্ধ হতে পুরো মস্তিষ্কের কাজ বন্ধ হতে হয়, নাকি নির্দিষ্ট কোনো অংশ নিষ্ক্রিয় হওয়া জরুরি তা নিয়ে বিশ্লেষণ রয়েছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক নিক ফ্র্যাঙ্কস জানান, মস্তিষ্কের স্ক্যান থেকে দেখা যায় কিছু অংশ অ্যানেস্থেশিয়ার প্রতি বেশি সংবেদনশীল। বিশেষ করে মস্তিষ্কের গভীরে থাকা ‘থ্যালামাস’ নামক অংশটির কার্যকারিতা দ্রুত কমে যায়, যা ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এমনকি অ্যানেস্থেশিয়ায় থাকা প্রাণীকে থ্যালামাসে উদ্দীপনা দিয়ে জাগিয়ে তোলার প্রমাণও মিলেছে। তবে অন্য একদল বিজ্ঞানীর মতে, মস্তিষ্কের বাইরের স্তর ‘সেরিব্রাল কর্টেক্স’ ছাড়াও ফ্রন্টাল ও প্যারাইটাল লোব চেতনার মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
এদিকে সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি একটি ‘তৃতীয় অবস্থায়’ চলে যেতে পারে। সাধারণত অ্যানেস্থেশিয়ার পর অস্ত্রোপচারের কোনো স্মৃতি থাকে না। কিন্তু প্রতি ১৫ হাজার রোগীর মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়, যা ‘অ্যাক্সিডেন্টাল অ্যাওয়ারনেস’ নামে পরিচিত। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি হসপিটালসের কনসালট্যান্ট অ্যানেস্থেটিস্ট জাইদীপ পণ্ডিতের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ দেওয়ার পরও কৃত্রিমভাবে পেশি মুক্ত রাখা হাতের আঙুল নাড়িয়ে নির্দেশ পালন করতে পেরেছেন কিছু রোগী। তাদের মধ্যে কোনো ব্যথা বা জেগে ওঠার শারীরিক লক্ষণ ছিল না, যা চেতনার ভিন্ন একটি স্তরের জানান দেয়।
বিজ্ঞানীদের কাছে চেতনার উৎপত্তি জানা আজও বড় এক অমীমাংসিত বিষয়। তবে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়া লুপি জানান, অ্যানেস্থেশিয়ার সময় মানুষের মস্তিষ্কের স্বতন্ত্র ধরন বা ‘ফাংশনাল কানেক্টিভিটি’ লোপ পায় এবং সবার মস্তিষ্ক প্রায় একই রকম আচরণ করতে শুরু করে। এ সময় মস্তিষ্কের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে কেবল সরাসরি যুক্ত থাকা অংশগুলো সক্রিয় থাকে। এর থেকে ধারণা করা হয়, চেতনা কোনো একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের কাজ নয়, বরং মস্তিষ্কের একাধিক কেন্দ্রের সমন্বিত যোগাযোগের ফসল।
বিজ্ঞানী লুপির মতে, অ্যানেস্থেটিক যেখানে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ কমায়, সাইকেডেলিক বা চেতনাবর্ধক পদার্থগুলো সেখানে নতুন যোগাযোগের পথ তৈরি করে। তবে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক বরিস হেইফেটস মনে করেন, চেতনা নিয়ে মানুষের বর্তমান জ্ঞান এখনো একেবারে প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। চেতনা কীভাবে কাজ করে তা পুরোপুরি বুঝতে এখনো অনেক দূর এগোতে হবে বিজ্ঞানকে।
সূত্র: বিবিসি
