
১৫ আগস্ট ১৯৭৫: যে সকাল অসম্পূর্ণ থেকে গেল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশেষ অভ্যর্থনা জানানোর আয়োজন ছিল। প্রায় এক মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই সফরকে ঘিরে প্রস্তুতি নিয়েছিল। দেয়ালে চুনকাম করা হয়েছিল, মোড়ে মোড়ে ব্যানার-ফেস্টুন টাঙানো হয়েছিল। কলাভবনের সামনের দেয়ালে বড় অক্ষরে লেখা ছিল—‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব সফল হোক’। মুজিববাদ ও বাকশালের স্লোগান ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ক্যাম্পাসজুড়ে।
সেদিন সকালেই শহীদ মিনারের কাছে ফুলের মালা তৈরি করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে অবস্থিত শহীদের মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা ছিল। এরপর ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা ও ক্রেস্ট, অগ্রগতির অ্যালবাম এবং রবীন্দ্র রচনাবলির মোড়ানো খণ্ডগুলো উপহার দেওয়ার কথা ছিল। শিক্ষক ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বাকশাল সদস্যপদের আবেদনপত্রও জমা দেওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথের প্রতি শেখ মুজিবের অনুরাগ সবাই জানত বলেই কর্তৃপক্ষ সেই রচনাবলি উপহার হিসেবে বেছে নিয়েছিল।
কিন্তু সেই সকাল আর সেভাবে আসেনি। ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আর কোনো গন্তব্যে পৌঁছাননি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সাজানো মঞ্চ, তাজা ফুল, রঙিন কাগজে মোড়ানো বই আর অপেক্ষমাণ মানুষ—সবকিছুই সেদিন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
খবরের কাগজের পাতায় সেদিন সকালেই ছাপা হয়েছিল তাঁর আগমনের খবর। দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক বাংলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতির বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল। পাঠকরা যখন সেই পাতা উল্টাচ্ছিলেন, তখন ঘটনা ইতিমধ্যেই ঘটে গিয়েছিল।
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও শাসনামল নিয়ে নানা মত আছে। সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আস্থা ও আশ্রয়ের প্রতীক। অনেকের চোখে তিনি প্রায় দেবতুল্য। স্বাধীন দেশে তাঁর কাছে পৌঁছালেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন বিশ্বাস অনেকের মধ্যে ছিল। অন্যদিকে, তৎকালীন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, জাসদের তরুণ অংশ এবং কিছু বাম ও ইসলামপন্থী মহল তাঁর সরকারের কঠোর পদক্ষেপ, বিশেষ করে রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা এবং প্রশাসনিক চাপ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করত। বাকশাল গঠন ও একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগোতে গিয়ে তিনি অনেকটা একা হয়ে পড়েছিলেন বলেও অনেকে মনে করেন।
তবু গণমানুষের কাছে তাঁর পরিচয় ছিল টুঙ্গিপাড়ার সরল ‘মিয়া ভাই’ থেকে শুরু করে ‘শেখ সাহেব’ এবং শেষে কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত ‘বঙ্গবন্ধু’। শত বছরের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেই মানুষটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল ১৫ আগস্ট সকালে। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বরণ করার জন্য সব প্রস্তুত রেখেছিল। কিন্তু ইতিহাসের সেই সকালে তিনি আর সেখানে পৌঁছাতে পারেননি।
