
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনের শুভেচ্ছা….
বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল অনেকটা পৌরাণিক এক অগ্নিদেবতার মতো। তিনি নিজ হাতে বাংলা সাহিত্যের চিরায়ত প্রথা ভেঙেছেন, আবার নিজ হাতে গড়েছেন সাহিত্যের নবধারা। তাঁর লেখনীতে একই সাথে বিদ্রোহী ও জাতীয়তাবাদী চেতনার সংমিশ্রণ ঘটেছিল। যার কারণেই তাঁকে বিদ্রোহী কবি ও জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
নজরুলের কবিতা ও গানে বাঙালি জাতীয়তাবোধের যে স্ফুরণ দেখা যায়, তা বিংশ শতাব্দীর অনেক কবির রচনাতেই অনুপস্থিত। বিভিন্ন গল্প ও প্রবন্ধেও তাঁর এই চেতনার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। তাঁর লেখা প্রবন্ধগুলোতে তিনি বিশ্বসমাজে বাঙালির পিছিয়ে থাকা এবং এ থেকে মুক্তির উপায় কী হতে পারে তার বর্ণনা করেছেন। বাঙালির সমাজ, সভ্যতা, রাজনীতি ছিল তাঁর আগ্রহের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রকাশ্যে ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকর্মেই বাঙালি জাতীয়তাবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে
‘ধূমকেতু’ পত্রিকা সম্পাদনার সময় নজরুল প্রতি সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ভারতবর্ষের স্বাধিকার আদায় নিয়ে লিখতেন। তাঁর এই পত্রিকা বাঙালি তরুণ সমাজে স্বাধীনতার স্বপ্ন তৈরিতে কাজ করেছে। ১৯৪৭ এর দেশবিভাগের জন্য সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নজরুলের লেখনী হয়ে উঠেছে উৎসাহ ও প্রেরণার উৎস। তার লেখনীতে প্রবল জাতীয়তাবোধের প্রকাশ স্বাধীনতাকামী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নজরুলের কবিতা ও গান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণার উৎস। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত নজরুলের দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতো। স্বাধীনতার পর নজরুল রচিত ‘চল্ চল্ চল্’ গানটিকে বাংলাদেশ সরকার রণসংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। নজরুল ইসলাম ব্যক্তিজীবনে স্বাধীনচেতা একজন মানুষ ছিলেন। তাই তিনি জাতিগতভাবেও স্বাধীন হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তাই সেই বয়সেই তিনি এয়ারগান কিনে হাতের নিশানা ঠিক করার কথা ভেবেছিলেন। নজরুল বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতেন। ভাবতেন ভারতবর্ষের সব মানুষের মুক্তির কথা।
কাজী নজরুলের বাল্যজীবন, কৈশোরজীবন এমনকি তাঁর পুরো জীবনই ছিল দারিদ্র্যের আঘাতে জর্জরিত। এর মাঝেও তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন, গান লিখেছেন, মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছেন। এমন প্রতিকূলতার মাঝেও তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল পরিপূর্ণভাবেই। ধারণা করা হয়, দারিদ্র্য তাঁকে সমাজবাস্তবতার স্বরূপ চিনতে সাহায্য করেছে, যার কল্যাণে তিনি সাহিত্য রচনায় পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছেন। নজরুল নিজেও তার দারিদ্র্যতাকে এভাবে সম্বোধন করেছেন, ‘হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান’। দারিদ্র্যের রূপ দেখার ফলে খুব অল্প বয়সেই নজরুল অনুধাবন করেছিলেন মানুষের মুক্তির কথা। এই ধারণা তাঁকে আরও অগ্রসর করে দেশের স্বাধীনতা আদায়ে।
নজরুল অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বাঙালির এই পিছিয়ে থাকার কারণ তাদের দাসত্ব। ইংরেজদের শাসন বাঙালিকে কীভাবে শক্তিমান, সাহসী জাতি থেকে পরাধীন এক দাসে পরিণত করেছে, তা নজরুল খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করেছিলেন। বাঙালির অর্থনীতির দুর্দশা যে ইংরেজ শাসনেরই ফল এটি বুঝতেও তাঁর খুব বেশি দেরি হয়নি। তাই অল্প বয়স থেকেই ইংরেজদের প্রতি নজরুল ছিলেন প্রতিবাদী। তাঁর বিদ্রোহী কবিতাগুলোর অনেকাংশই ইংরেজদের উদ্দেশ্য করে লেখা। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে এই বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার আদায়ের জন্য।
ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের বিশ্বাসঘাতক মনে করত। এ কারণে ইংরেজ সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ দেওয়া হতো না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বিশিষ্ট বাঙালি নাগরিকদের দাবির মুখে ইংরেজ সেনাবাহিনীতে বাঙালি পল্টন খোলা হয়। ১৯১৭ সালে নজরুল সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে যোগদান করেন। তিনি সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি বাঙালিদের সাহস ও শৌর্য প্রকাশের সুযোগ হিসেবে মনে করতেন। তাই তিনি শুরু থেকেই প্রবল উৎসাহী ছিলেন সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে। নজরুলের সমগ্রজীবনই ছিল এমন। প্রতি পদক্ষেপে তিনি বাঙালিকে উচ্চাসনে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি নিজের সর্বোচ্চ শক্তি অর্থাৎ লেখনীর মাধ্যমেই বাঙালির মুক্তির আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন।
